একটি শহর কি মানুষের আয়ু বাড়াতে পারে? আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস সেই প্রশ্নের এক জীবন্ত উদাহরণ। এই শহরকে বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর শহর বলা হয়, যেখানে বসবাসকারী মানুষের গড় আয়ু অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেক বেশি। কীভাবে বুয়েনস এইরেস এমন একটি জীবন-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছে, আসুন জেনে নেওয়া যাক।

কেন বুয়েনস এইরেস বিশ্বের স্বাস্থ্যকর শহর?

বুয়েনস এইরেসের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে সুন্দর সবুজ রাস্তা, যা ছায়ায় ঢাকা এবং পাখিদের কলরবে মুখরিত। মনে হয় যেন এটি কোনো উদ্যানের মাঝে গড়ে ওঠা এক নগরী। প্রতিটি নাগরিকের জন্য এখানে প্রায় ৬০ বর্গফুট সবুজ গাছপালা রয়েছে, আর রয়েছে প্রায় ১১৪০টির মতো পার্ক। এই বিশাল সবুজের পরিমাণ শহরের পরিবেশকে শান্ত ও নির্মল রাখে, যা নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যও আরামদায়ক।

  • প্রশস্ত এভিনিউ: এখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রশস্ত এভিনিউ, যার নাম ‘এভিনিউ নাইন দা জুলিও’। এটি প্রায় ৪,৫০০ ফুট চওড়া এবং ১৬ লেনের। এত প্রশস্ত সড়ক দূষণ প্রায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
  • গাছপালায় ঢাকা শহর: শহরজুড়ে প্রায় ২০৫ কিলোমিটার সড়ক ও গলি গাছপালায় ঢেকে রাখা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস বা বাড়ির সামনেও রয়েছে বড় বড় গাছ। এখানে গাছ কেটে কোনো স্থাপনা তৈরি করার কোনো অনুমতি নেই।
  • পরিকল্পিত নগরায়ন: শুধু সবুজ নয়, পরিকল্পিত নগরায়ন, স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা এবং প্রচুর পার্ক, খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা থাকার কারণে বুয়েনস এইরেস বিশ্বের অন্যতম প্রশান্তিময় শহরে পরিণত হয়েছে।

বুয়েনস এইরেসের মানুষের দীর্ঘ জীবন ও দৈনন্দিন রুটিন

বুয়েনস এইরেসে বসবাসকারী মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৮০ বছর, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরগুলোতে এই আয়ু ৭০ থেকে ৭২ বছর। এমনকি এই শহরে ১১০ বছরের বেশি বয়সী অনেক মানুষও রয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে তাদের সুশৃঙ্খল এবং প্রকৃতির কাছাকাছি জীবনযাপন।

এখানকার মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম ভোর পাঁচটায় শুরু হয় এবং বিকেল তিনটায় শেষ হয়। সন্ধ্যার আগে তারা পার্কে ঘোরেন, হাঁটেন এবং নির্মল হাওয়া উপভোগ করেন। ডিনার হয় বিকেল পাঁচটা-ছয়টার দিকে, এবং সন্ধ্যার পরই তারা ঘুমাতে যান। এই স্বাস্থ্যকর রুটিন তাদের কর্মশক্তি বাড়ায় এবং মুখে বিরক্তি কম দেখা যায়।

আর্জেন্টিনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

আর্জেন্টিনা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ, যার আয়তন প্রায় ২৮ লাখ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা মাত্র পৌনে পাঁচ কোটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ১৭ জন মানুষ বসবাস করে। প্রকৃতি যেন তার সমস্ত সৌন্দর্য এখানে ঢেলে দিয়েছে।

  • ইগুয়াজু জলপ্রপাত: ব্রাজিলের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত ইগুয়াজু জলপ্রপাত, যা নায়েগ্রা ফলসের চেয়েও বড়। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২৫০ ফুট উঁচু থেকে পানির ধারা অবিরাম ঝরছে।
  • কৃষি ও চারণভূমি: আর্জেন্টিনার কৃষি এবং সবুজ চারণভূমিও বিশ্ববিখ্যাত। এ কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর গরুর মাংস আর্জেন্টিনায় পাওয়া যায়।
  • পৃথিবীর শেষ শহর: দেশটির দক্ষিণ প্রান্তের উশুইয়াইকে বলা হয় ‘পৃথিবীর শেষ শহর’। এখান থেকেই অভিযাত্রীরা অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণে যান। শহরের কোল ঘেঁষে রয়েছে আন্দিজ পর্বতমালার সারি, যার সৌন্দর্য হিমালয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

প্রকৃতি মানুষের জীবন প্রবাহের ওপর দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। মানুষের কাজ, সংসার, এবং মনস্তাত্ত্বিক জায়গাতে এটি একটি চমৎকার বিন্যাস নিয়ে আসে। বুয়েনস এইরেস তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

এই ভিডিওতে আপনি দেখবেন কীভাবে বুয়েনস এইরেস তার সবুজ পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, এবং পরিকল্পিত নগর জীবনের মাধ্যমে মানুষের আয়ু বাড়িয়ে একটি বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যকর শহর হয়ে উঠেছে। এই শহরে মাথাপিছু সবুজ এলাকা অনেক বেশি, রাস্তাগুলো ছায়াঘেরা, এবং এখানকার মানুষ কম বিরক্ত ও বেশি কর্মক্ষম। তাই এই শহরে মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৮০ বছর। এটি কেবল একটি সুন্দর শহর নয়, বরং পরিকল্পিত নগরায়ন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

যোগাযোগ: [email protected]