বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একসময় ‘মফিজ’ শব্দটি উপহাসের প্রতীক ছিল। বিশেষ করে গাইবান্ধা অঞ্চলের দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষদের এই নামে ডাকা হতো। কিন্তু একজন ব্যক্তি এই বদনাম ঘুচিয়ে দিয়েছেন, তিনি হলেন এম আব্দুস সালাম। তিনি শুধুমাত্র নিজের নয়, প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন বদলে দিয়েছেন এবং তাদের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন।

গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের জন্ম ও প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ

গাইবান্ধা একসময় দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলাগুলোর মধ্যে একটি ছিল, যেখানে আকাল-মঙ্গায় মানুষ না খেয়ে মারা যেত। কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতি বছর বহু মানুষ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যেত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অভাবে ভুগছিল অসংখ্য পরিবার। এই প্রেক্ষাপটেই এম আব্দুস সালাম তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে ১৯৮৫ সালে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (GUK) প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল নিজ এলাকার এই দুর্দশাময় চিত্র পরিবর্তন করা।

শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান: একটি সামগ্রিক উন্নয়ন মডেল

আব্দুস সালাম ও তার দল প্রথমেই শিক্ষা প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন। বয়স্কদের বিনা পয়সায় পড়ানো শুরু করেন। এই শিক্ষা প্রকল্প এখন ১৭টি জেলায় বিস্তৃত এবং লাখো শিশু-কিশোর ও বয়স্ক এর আওতায় পড়াশোনা করছে। এর পাশাপাশি, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র অভাবী মানুষদের চিকিৎসার সুবিধাও দিচ্ছে।

তাদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে:

  • ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে এনে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া।
  • নদী ভাঙন ও বন্যা কবলিত অসহায় মানুষের জন্য পুনর্বাসন ও সুরক্ষা প্রকল্প চালানো।
  • জীবিকার জন্য গবাদি পশুসহ নানা সরঞ্জাম বিতরণ, যা মানুষকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছে।
  • নারীদের উন্নয়নে বিপ্লব আনা, যেখানে প্রায় এক লাখ গ্রামীণ নারী এখন সরাসরি কর্মজীবী এবং সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

পরিবেশ সুরক্ষা ও মানবিক উদ্যোগ

গণ উন্নয়ন কেন্দ্র বর্তমানে নিরাপদ অভিপ্রয়াণ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও কাজ করছে। গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও রংপুরের নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য তারা সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ সহনশীল চাষাবাদে অভ্যস্ত করা, বাড়ি উঁচু করা এবং স্থানান্তরযোগ্য ঘর তৈরির মতো সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তাদের ব্যতিক্রমী ‘ফুড ব্যাংক’ প্রকল্প, যেখানে গ্রামের সবাই মিলে চাল জমা করে এবং বিপদের সময় ধার দেয়, আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়েছে।

‘সালাম ভাই’ একজন সাধারণ অভিভাবক

আব্দুস সালাম নির্বাহী প্রধান হলেও, গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের হাজারো কর্মী এবং গ্রামের মানুষ তাকে ‘স্যার’ নয়, ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি সকলের সাথে মাটিতে বসে কথা শোনেন এবং তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। তার এই সহজলভ্যতা এবং আত্মিক সম্পর্কই তাকে গাইবান্ধার মানুষের সত্যিকারের অভিভাবকে পরিণত করেছে। আজ প্রায় আড়াই হাজার কর্মী নিয়ে গণ উন্নয়ন কেন্দ্র ৩২টি প্রকল্পে কাজ করছে, যার মূল উদ্দেশ্য দারিদ্র্য দূর করে গ্রামীণ মানুষকে স্বাবলম্বী করা। এর মাধ্যমে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন এবং নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন।

গাইবান্ধার আবদুস সালাম একসময় বেকার ছিলেন, আজ তিনি লক্ষ মানুষের আশার আলো। তার গণ উন্নয়ন কেন্দ্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। ১৯৮৫ সালে শুরু হওয়া এই ছোট্ট পদক্ষেপ এখন ১০ লাখ মানুষের উন্নয়নের গল্প। ‘সালাম ভাই’ শুধু নেতা নন, তিনি সাধারণ মানুষের সত্যিকারের অভিভাবক।

আমাদের সাথে থেকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের অজানা-অচেনা অনুপ্রেরণার গল্প জানুন। নতুন এপিসোড মিস না করতে সাবস্ক্রাইব করুন।

কোন প্রশ্ন থাকলে আমাদের ইমেল করুন: [email protected]