সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কেন ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করেছে? এর উত্তর আমরা সবাই জানি। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার নিজ দেশ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশটির খনিজ তেল লুট করা।
তবে বিশ্বের খনিজ তেল উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর দিকে তাকালে খানিকটা খটকা লাগতে পারে। কারণ সমগ্র বিশ্বে তেল উৎপাদনের দিক থেকে এক নম্বর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব তালিকায় দুই নম্বরে আর রাশিয়া আছে তিন নম্বরে। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলার অবস্থান তালিকার 18 নম্বরে।
যুক্তরাষ্ট্র শুধু বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশই নয় বরং তেল আমদানির দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দ্বিতীয় এবং তেল রপ্তানির দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো খনিজ তেলে যুক্তরাষ্ট্র এতটা সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কেন ভেনিজুয়েলের তেলের দিকে তাদের নজর দিতে হলো? ভেনিজুয়েলার তেলে কি এমন আছে যে কারণে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার করে কোন ধরনের উস্কানি ছাড়াই একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ দখল করার মতো এমন ঘৃন্ন পদক্ষেপ নিল সে সম্পর্কেই আলোচনা করা হবে কি কেন কিভাবে এই পর্বে।
২০০৫ সালে তেল উৎপাদনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ভেনিজুয়েলা ও সৌদি আরব তিন দেশই মোটামুটি একই কাতারে ছিল। কিন্তু সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদন হঠাৎ করেই আকাশচুম্বি হয়ে যায়। অন্যদিকে ভেনিজুয়েলার তেল উৎপাদন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। তাহলে ভেনিজুয়েলার তেল নিয়ে আমেরিকার মাথা ব্যথার কারণটা কি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উত্তোলন ব্যবস্থায়।
যুক্তরাষ্ট্র ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। আমরা হয়তো মনে করছি পৃথিবীর সকল অপরিশোধিত তেলই একরকম। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়। সহজ করে বললে খনি থেকে উত্তোলন করা তেল কতটা ঘন বা পিচ্ছিল সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে হালকা অপরিশোধিত তেল দেখতে অনেকটা শরবতের মতো। মাঝারি ঘনত্বের তেল কালচে রঙের কিন্তু অতটা আঠালো নয়। একেই সাধারণত ক্রুড অয়েল বলা হয় এবং সবচেয়ে ভারী অপরিশোধিত তেল অত্যন্ত ঘন, আঠালো এবং কাদার মতো দেখতে। এই ধরনের ভারী তেল সারা বিশ্বে খুব কম পাওয়া যায়।
লক্ষ কোটি বছর ধরে মাটির নিচে তেল তৈরি হওয়ার সময় ভৌগোলিক এবং জৈবিক পরিস্থিতির পার্থক্যের কারণেই একেক এলাকায় একেক ধরনের ঘনত্বের তেল তৈরি হয়। কিন্তু খনি থেকে উত্তোলন করা এসব তেল সরাসরি কোন কাজে লাগানো যায় না। সে কারণেই এদেরকে বলা হয় অপরিশোধিত তেল।
অপরিশোধিত খনিজ তেল শোধন করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অসংখ্য রিফাইনারি আছে। সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় শতাধিক তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি রয়েছে। তবে দেশটির সবচেয়ে বড় বড় রিফাইনারি আছে ক্যালিফোর্নিয়ায়। কারণ শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল এই অঞ্চলেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। এবং প্রথমদিকে আমেরিকায় আবিষ্কৃত তেলগুলো ছিল মূলত সবচেয়ে ভারী ধরনের অপরিশোধিত তেল। সেই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রিফাইনারি গুলোর অধিকাংশই মূলত ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
আমেরিকা মূলত ঘন আঠালো তেলকে পেট্রোল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যে রূপান্তর করে। কিন্তু পরবর্তীতে ব্রিটিশ শেল কোম্পানি যখন ফ্র্যাকিং প্রযুক্তি দিয়ে আমেরিকায় তেল উত্তোলন করতে শুরু করে তখন থেকে বেশিরভাগই হালকা ধরনের অপরিশোধিত তেল উঠতে থাকে। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন হচ্ছে তার সিংহভাগই এই হালকা তেল।
আর এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবকাঠামোর সঙ্গে বাস্তব উৎপাদনের এক ধরনের কাঠামোগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। কারণ আমেরিকার অধিকাংশ রিফাইনারি ঘন তেল পরিশোধন করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশটির খনি থেকে উঠছে হালকা তেল। তাই আমেরিকার তেল শোধনাগার গুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রচুর পরিমাণে ভারী অপরিশোধিত তেল আমদানি করা দরকার।
- যুক্তরাষ্ট্র যতই রেকর্ড পরিমাণ তেল উৎপাদন করুক না কেন বাস্তবে তাদের নিজ দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য এখনো বিপুল পরিমাণ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
- যুক্তরাষ্ট্রের একসময় মোট আমদানির মাত্র 12 শতাংশ ছিল ভারী ও ঘন অপরিশোধিত তেল কিন্তু এখন সেই হার প্রায় 70 শতাংশ পৌঁছেছে।
- অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে যে তেলের প্রয়োজন তার সিংহভাগই ভারী অপরিশোধিত তেল।
- এই ভারী তেল আসলে সমগ্র বিশ্বে খুবই কম পাওয়া যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে এর নির্ভরতা প্রধানত তিনটি দেশ থেকে, যা হচ্ছে কানাডা, ভেনিজুয়েলা ও রাশিয়া।
- কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে।
- ভেনিজুয়েলা থেকেও অতীতে ভারী তেল আসতো, কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক জটিলতার কারণে তেল সরবরাহ বন্ধ।
- রাশিয়া থেকে বৈধভাবে তেল আমদানি করা এখন প্রায় অসম্ভব।
অতএব, আমেরিকার তেল শিল্প বাঁচানোর জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে ভেনিজুয়েলার তেল কেনা। কিন্তু ভেনিজুয়েলা বহু আগেই তাদের দেশের তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করে আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে বের করে দিয়েছে। এজন্য ভেনিজুয়েলায় হামলা করে তেল লুট করাই ট্রাম্পের একমাত্র অবলম্বন।
আবার যুক্তরাষ্ট্রের তেল অঙ্গনের স্ট্রাকচারের দিক থেকে দেখতে গেলে, উত্তরের রিফাইনারি গুলো মূলত কানাডা থেকে আসা ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য তৈরি এবং দক্ষিণাঞ্চলের রিফাইনারিগুলো ভেনিজুয়েলার ভারী তেলের জন্য তৈরি। ভেনিজুয়েলার তেল সরবরাহ ন্যূনতার কারণে এই দক্ষিণাঞ্চলের রিফাইনারিগুলো লাভজনক নয়।
তবে, ভারী তেলের জন্য নির্দিষ্ট রিফাইনারি পরিবর্তন করা খুবই ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র পুরনো রিফাইনারিগুলো চালু রাখতে হলে ভেনিজুয়েলার ভারী তেলই কিনতে হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদ তালিকায় ভেনিজুয়েলার অবস্থান শীর্ষে। এ ক্ষেত্রে তার বিপুল ভারী তেল যোগানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নিবিড়। পাশাপাশি ভেনিজুয়েলার তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
তবে, আমেরিকা ও ভেনিজুয়েলার মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন নয়, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের দীর্ঘ ফলাফল।
বর্তমান সময়ে এআই না শিখলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। যারা এআই ব্যবহার শুরু করতে ভয় পাচ্ছেন, তারা কিকেনকিভাবে একাডেমির এআই দক্ষতা কোর্সে ভর্তি হতে পারেন। কোর্সের লিংক ভিডিওর ডেসক্রিপশনে এবং পিন কমেন্টে দেওয়া আছে।
Ki Keno Kivabe?

Leave a Reply