দুবাই প্রবাসীদের মধ্যে একটি পরিচিত নাম, ইয়াকুব সৈনিক। তার জীবন যেন এক অসাধারণ অনুপ্রেরণার গল্প। নামে সৈনিক হলেও, কর্মক্ষেত্রে তিনি একজন সেনাপতির মতোই নেতৃত্ব দিয়েছেন নিজের জীবন ও অসংখ্য মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে। অভাবের তাড়নায় নয়, বরং নিজের স্বপ্ন পূরণের অদম্য জেদে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন দুবাইয়ে।
কে এই ইয়াকুব সৈনিক?
১৯৯৯ সালে একজন সাধারণ কর্মী ভিসায় দুবাই এসেছিলেন ইয়াকুব সৈনিক। প্রথম চার মাস কোনো কাজ না পেয়ে তাকে নির্ভর করতে হয়েছিল ওমান প্রবাসী বড় ভাইয়ের পাঠানো টাকার উপর। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে তার মনে জেদ চেপে বসে। হাতে থাকা মাত্র ৪০ দিরহাম পুঁজি করে দুবাইয়ের পাইকারি সবজি বাজার থেকে সবজি কিনে বেচাকেনা শুরু করেন। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল হিসেবে তিনি ধীরে ধীরে সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় পাইকারি সবজি ও ফলবাজার আলাউইরে তিনি এক ডজনেরও বেশি দোকানের মালিক হন। শুধু ব্যবসাতেই নয়, ওই বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি নির্বাচিত হন।
আলাউইরে সফলতার পর ইয়াকুব সৈনিক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। ‘কেবিএন’ নামে তার প্রথম রেস্টুরেন্টটি দ্রুত দুবাইয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমানে ‘কেবিএন’ ব্র্যান্ডের সাতটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যার প্রতিটির মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা। রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি তার রিয়েল এস্টেট, ট্রেডিং, টুরিজম সহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে।
একজন মানবিক সৈনিক
ইয়াকুব সৈনিকের আর্থিক সফলতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার মানবিক কাজগুলো। অনেকে তাকে মেজাজী বললেও, বিপদে পড়া প্রবাসীদের জন্য তিনি যেন এক নির্ভরযোগ্য বন্ধু। দুবাইয়ে প্রতারিত অনেক বাংলাদেশী তার শরণাপন্ন হন এবং তিনি তাদের টাকা উদ্ধারে সহায়তা করেন। দুবাই থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে মরুভূমির মধ্যে তিনি একটি ফার্ম হাউস তৈরি করেছেন, যা প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য একটি খামারবাড়ির মতো। এখানে শাক, সবজি, হাঁস, মুরগি, ছাগলের চাষ হয় এবং এটি বাংলাদেশীদের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মিলনস্থল। পয়লা বৈশাখ, ঈদ, রমজান, এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠানও এখানে বিনামূল্যে আয়োজন করা হয়। এই ফার্ম হাউস সহ তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশী কাজ করেন, যেখানে তিনি তাদের কাছে মালিক নন, বরং একজন আপন ভাই বা আত্মীয়ের মতো।
প্রবাসীদের পাশে সবসময়
ইয়াকুব সৈনিক শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, তিনি বহু অসহায় প্রবাসীকর্মীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিনা চিকিৎসায় হাসপাতালে থাকা প্রবাসীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন এবং অনেকের মরদেহ নিজ খরচে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। তার এই মানবিক কাজের জন্য দূতাবাস ও আমিরাত সরকারেরও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। করোনাকালীন সময়ে যখন সবকিছু বন্ধ ছিল, তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মহীন কর্মীদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ত্রাণ ও খাবার সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। এজন্য তিনি নিজের একটি সেবা ফাউন্ডেশনও খুলেছিলেন, যা এখনো সক্রিয় আছে। দেশেও তিনি বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগে যুক্ত আছেন। দুবাই, আবুধাবি, শারজা বা আজমানে যেকোনো পারিবারিক বিচার-সালিশ বা অনুষ্ঠান আয়োজনে সবাই তাকেই ডাকেন, আর তিনিও মন খুলে ছুটে যান।
ইয়াকুব সৈনিকের গল্প আমাদের শেখায় যে, সত্যিকারের মানবিকতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বড় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা বিশাল সংগঠনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটি বড় মন এবং অদম্য ইচ্ছা। জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে প্রবাসীদের জন্য সহানুভূতি ও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে তিনি এক সত্যিকারের সেনাপতির ভূমিকা পালন করছেন।
দুবাই প্রবাসীদের মধ্যে এক অনন্য নাম — ইয়াকুব সৈনিক। অভাবে নয়, স্বপ্ন পূরণের জেদে দুবাই গিয়েছিলেন এই মানুষটি। মাত্র ৪০ দিরহাম দিয়ে শুরু করেছিলেন সবজি ব্যবসা, আজ তিনি আমিরাতের সফল উদ্যোক্তা, সমাজসেবক, আর প্রবাসীদের বিপদের বন্ধু। এই ভিডিও শুধু সফলতার নয়, এটি এক মানবিক বিপ্লবের গল্প। যেকোনো ঘটনা বা গল্প জানাতে ইমেইল করুন: [email protected]

Leave a Reply