মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর শেষ যুদ্ধ অভিযান ছিল তাবুক। মদিনা থেকে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার দূরের এই অঞ্চলে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ ছাড়াই এক ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। এই তাবুক অভিযান কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না, এটি ছিল তওবা, ধৈর্য এবং আল্লাহর অশেষ রহমতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই লেখায় আমরা মহানবী (স:)-এর সেই তাবুক সফর, এর পটভূমি এবং এর সাথে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো জানবো।
তাবুক অভিযান ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই অভিযানে তিনটি সাহাবীর তওবার ঘটনা এবং সুরা আত-তাওবা নাজিলের প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, তাবুক দুর্গ এই অভিযানের একটি জীবন্ত স্মারক হিসেবে আজও বিদ্যমান, যা দর্শনার্থীদের ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হতে সাহায্য করে।
মহানবীর তাবুক অভিযান: এক অসাধারণ বিজয়
মদিনা থেকে প্রায় সাড়ে সাতশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তাবুকে ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের সবশেষ যুদ্ধ অভিযান। এই অভিযানে প্রায় তিন হাজার মুসলিম সেনা অংশ নেন, যা সেই সময় মুসলিম বাহিনীর সবচেয়ে বড় সমাবেশ ছিল। সিরিয়া সীমান্তের এই এলাকাটি বাইজেন্টাইনদের আক্রমণের পথ হিসেবে পরিচিত ছিল। বাইজেন্টাইনরা মুসলিমদের আক্রমণ করতে আসছে এমন খবর পেয়েই প্রিয় নবী (স:) তপ্ত মরুভূমি ও পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
তিন সাহাবীর তওবা ও সূরা আত-তাওবার প্রেক্ষাপট
এই অভিযানের সময় তিনজন সাহাবী – কাব ইবনে মালিক, হিলাল ইবনে উমাইয়া এবং মুরাবা ইবনে রাবি – নানা অজুহাতে যুদ্ধ থেকে সরে যান। তাদের এই মুনাফিকির কারণে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করার নির্দেশ দেন। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে, তারা তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে বাধ্য হন। আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা কবুল করেন এবং এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই পবিত্র সুরা আত-তাওবা নাজিল হয়। এই খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (স:) তাবুকে শুকরিয়া আদায় করেন। তাবুকের সেই জায়গাতেই পরবর্তীতে তাওবা মসজিদ নির্মিত হয়।
যুদ্ধ ছাড়াই বিজয় ও ঐতিহাসিক তাবুক দুর্গ
মহানবীর তাবুক অভিযান ছিল এমনই এক আশ্চর্যজনক ঘটনা, যেখানে মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধ করতে হয়নি। প্রিয় নবী (স:) তার বাহিনী নিয়ে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষ বাহিনী ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেখানে পৌঁছে সেনারা কুয়া খুঁড়ে পানি তোলেন এবং একটি অস্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করেন।
তাবুকের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক তাবুক দুর্গ, যা এখনো হাজার বছর আগের জীবন্ত জাদুঘরের মতো। এই দুর্গটি মুসলিমদের সেই সময়কার গর্ব, গৌরব আর সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দুর্গের বিভিন্ন কামরা ঘুরলে যুদ্ধের সরঞ্জাম, শোবার ব্যবস্থা, রান্নার আয়োজন, অবসর এবং ইবাদতের স্থান সবই দেখা যায়। মজার ব্যাপার হলো, এই দুর্গ এখন এমনভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে যে, এর ভেতরে চাইলে আপনি আরবীয় খাবার, পোশাক এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহারও করতে পারবেন, তবে তার জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে।
রাসুল (স:) এর ইসলাম প্রচার ও রক্ষার অন্যতম একটি কেন্দ্র হিসেবে এই তাবুককে বিবেচনা করা হয়। এই দুর্গ থেকেই প্রিয় নবী (স:) এবং তার সাহাবীরা যুদ্ধ কৌশল নির্ধারণ করতেন। অটোমান আমলে, আনুমানিক খ্রিস্টীয় ১৬০০ শতকে এই দুর্গটি নির্মিত হয়েছিল এবং হজ যাত্রীদের বিশ্রামস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটি এখন মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তাবুকের বর্তমান চিত্র
তাবুক শহরটি খুব বড় না হলেও এর পাড়ায় পাড়ায় অনেক দোকান ও বসতি রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই বাংলাদেশীদের দ্বারা পরিচালিত। এই তাবুক দুর্গ বা মহানবীর স্মৃতিময় জায়গাটি একসময় ওল্ডটাউন ছিল, যার চারপাশ ঘিরে ছিল বাজার। এখন সেখানে অনেক নতুন স্থাপনা, মার্কেট ও দোকান হয়েছে, যেখানেও বাংলাদেশীরা আছেন। সন্ধ্যার পর তাবুক শহরের এই অংশে ঘুরলে এক পরম শান্তি পাওয়া যায়, মনে হয় যেন হাজার বছর আগের কোনো আরবীয় গ্রামে চলে যাওয়া গেছে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর সেই তাবুক অভিযান ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যেখানে যুদ্ধ ছাড়াই বিজয় অর্জিত হয়েছিল। এটি ছিল তিন সাহাবীর তওবা, ধৈর্য এবং আল্লাহর রহমতের এক নীরব ইতিহাস। তাবুক দুর্গ আজও ইসলামের এক জীবন্ত অধ্যায় হিসেবে বিদ্যমান।
যোগাযোগের জন্য: [email protected]

Leave a Reply