সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমায় অবস্থিত আল জাজিরা আল হামরা গ্রামটি স্থানীয়দের কাছে ভূতের গ্রাম নামেই পরিচিত। এটি এমন একটি স্থান যেখানে দিনেও স্থানীয়রা যেতে ভয় পান, রাতের কথা তো বাদই দিলাম। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই পরিত্যক্ত, ভগ্নপ্রায় গ্রামে বর্তমানে হাজারো বাংলাদেশী প্রবাসী বসবাস করছেন। তারা কিভাবে এই রহস্যময় স্থানে দিন কাটাচ্ছেন, এবং কেনই বা এই গ্রামটি ভূতের গ্রাম হিসেবে পরিচিত, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
আল জাজিরা আল হামরা এক পরিত্যক্ত গ্রাম
১৬০০ সালের দিকে আরব উপসাগর তীরের এই বসতি গড়ে তুলেছিলেন স্থানীয় মুক্তা সংগ্রহকারী জেলে ও মাঝিরা। পরে ব্যবসায়ীরাও এখানে এসে থাকতে শুরু করেন। প্রায় ৪৫০টি বাড়ি, একটি দুর্গ, স্কুল, বাজার এবং মসজিদ নিয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রামটি একসময় প্রাণবন্ত ছিল। মাটি, প্রবাল ও ঝিনুক মিশিয়ে তৈরি অদ্ভুত কায়দার ঘরগুলো মরুভূমির খর তাপেও শীতল থাকত, যা এখনকার স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও অবাক করে।
কিন্তু ১৯৬৮ সালে হঠাৎ করেই গ্রামের সব বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর ফেলে আবুধাবি বা দুবাইয়ের মতো শহরে চলে যান। এক যুগে সব মানুষ কেন গ্রাম ছেড়েছিলেন তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রাম পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে নানা অবিশ্বাস্য গল্প আর গুজব।
কেন এই গ্রাম ভুতুড়ে নামে পরিচিত
আল জাজিরা আল হামরাকে ভূতের গ্রাম বলার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন লোককথা। স্থানীয় আরবরা বলেন, এই গ্রামে জিনদের আছর ছিল, কিংবা সাগর থেকে ভূতরা এসে বসবাস শুরু করেছিল। এর ফলে অজানা রোগে বহু মানুষের মৃত্যুর পর বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে চলে যান। এই আধুনিক যুগেও জায়গাটিতে গেলে গা ছমছম করে। দিনেও স্থানীয়রা ওদিকে যান না। কেমন যেন ভুতুড়ে আর রহস্যময় চারদিক।
- স্থানীয়দের মতে, এখানে ভুতুড়ে আওয়াজ শোনা যায়।
- ভগ্নপ্রায় ঘরগুলোর দেয়ালে প্রায়ই বিচিত্র হাতের ছাপ দেখা যায়।
- অনেকে বিশ্বাস করেন, অভিশপ্ত আত্মা এখনো এখানে বসবাস করে।
ভূতের গ্রামে বাংলাদেশীদের আগমন
এত রহস্য আর ভয় থাকা সত্ত্বেও, আল জাজিরা আল হামরার একাংশে এখন অন্তত ২৬,০০০ বাংলাদেশী কর্মী বসবাস করছেন। মূলত রাস আল খাইমার বিভিন্ন নির্মাণ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা নিম্ন আয়ের প্রবাসীরা এখানে কম ভাড়ায় পুরনো বাড়িতে থাকেন। দুবাইয়ের মতো শহরে যেখানে একটি রুমের ভাড়া অনেক বেশি, সেখানে এখানে খুব কম খরচে থাকা যায়।
এই প্রবাসীরা নির্ভয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করলেও, স্থানীয়রা এখনো এই গ্রামে যান না। তারা বিশ্বাস করেন যে এখানে জিন-ভূতের বসতি আছে এবং সুযোগ পেলে তারা ক্ষতি করে দিতে পারে। তবে বাংলাদেশীদের পাশাপাশি পাকিস্তানি, ভারতীয়, নেপালি, শ্রীলঙ্কান, ফিলিপিনো এবং আফগানিস্থানের লোকও এই এলাকায় বাস করে। এমনকি ইউরোপিয়ানরাও কিছুটা দূরে থাকেন।
ভবিষ্যতের রাস আল খাইমা
রাস আল খাইমা প্রদেশটি বর্তমানে দ্রুত গতিতে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। এখানে দুনিয়া সেরা ক্যাসিনো, সাততারা হোটেল সহ তাক লাগানো নানা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, যা দুবাইয়ের সাথে রীতিমত প্রতিযোগিতা করছে। আর এসব নির্মাণ কাজে বড় ভূমিকা রাখছেন বাংলাদেশীরা।
এই উন্নয়নের কারণে, আল জাজিরা আল হামরার পুরনো বাড়িগুলো থেকে এখন বাসিন্দাদের অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে যারা এখানে ব্যবসা বা বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য এখনো অনেক সুযোগ রয়েছে। এখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে আয় করার সুযোগ পান এবং স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।
ভয়, রহস্য আর ইতিহাস একসাথে মিশে থাকা আরব আমিরাতের রাস আল খাইমায় অবস্থিত ভূতের গ্রাম আল জাজিরাহ আল হামরা। স্থানীয়দের কাছে এখনো “জীনের গ্রাম” নামে পরিচিত এই স্থানটি। দিনে কেউ যায় না, রাতে তো নয়ই। অথচ এই ভগ্নপ্রায় পুরনো ঘরেই বসবাস করছেন হাজারো বাংলাদেশী প্রবাসী। এখানে বিজনেস করার অনেক অপরচুনিটি আছে।
আমাদের এই ভিডিওতে দেখুন: কেন এই গ্রাম হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেলো? কেন স্থানীয়রা এখনো এড়িয়ে চলে? কিভাবে বাংলাদেশীরা সেখানে সাহস করে বসবাস করছেন?
mail us at [email protected]! We’d love to hear from you.

Leave a Reply