বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নেতা এসেছেন, যারা তাঁদের সরল জীবনযাপন এবং আদর্শ দিয়ে দেশ ও বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এমনই একজন ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি লুঙ্গি পরে হেঁটেছেন দেশের পথে প্রান্তরে, অথচ তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্বনেতার সম্মান।

মাওলানা ভাসানীর সরল জীবন

মাওলানা ভাসানী তাঁর জীবদ্দশায় বিলাসিতা বা আড়ম্বরকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। তিনি মাত্র পাঁচ টাকার লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পড়তেন এবং মাথায় তালের টুপি পরতেন, যার দাম ছিল এক-দুই আনার বেশি নয়। মাটির পাটিতে বসে ভাত খেতেন এবং ছোট্ট কাঠের চেয়ারে বসতেন। তিনি ছনের কুঁড়েঘরে বসবাস করতেন, অথচ তাঁর সম্মান ছিল আকাশচুম্বী। টাঙ্গাইলের সন্তোষে এলে আজও তাঁর এই সরল জীবনযাপনের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। সেখানে তাঁর দরবার হলে কোনো শান-শওকত ছিল না, সবাই মেঝেতে বসতেন, আর তাঁর “সিংহাসন” ছিল একটি সাধারণ কাঠের চেয়ার। নিজের নামে বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নিজের থাকার কোনো স্থায়ী জায়গা ছিল না।

বিশ্বনেতা মাওলানা ভাসানী

তাঁর সময়ের বাঘা নেতারা যেমন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সরোয়ারদী, শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁর সামনে বসতে সাহস পেতেন না। ৭০-৭৫ বছর আগে তিনি একবার ডাক দিলেই লাখো মানুষ জমায়েত হতো, যা এই দেশে আর কখনো হয়নি। তিনি কারো কাছ থেকে কোনো উপহার নেননি, বাড়ি গাড়ি বা সম্পত্তি করেননি। তাঁর জমিদার শ্বশুর যেসব সম্পত্তি দিয়েছিলেন, তাও তিনি মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই ত্যাগ ও জনমুখী রাজনীতি তাঁকে মহাত্মা গান্ধী, মাও সে তুং, উইনস্টন চার্চিল, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতাদের সাথে তুলনা এনে দিয়েছে।

তাঁর রাজনৈতিক অবদান

মাওলানা ভাসানী ছিলেন একজন প্রকৃত তৃণমূল রাজনীতিবিদ। তিনি পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, কৃষক, মজুর, শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁদের অধিকার নিয়ে সারাজীবন কথা বলেছেন। তিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ— এই তিন আমলেই স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ন্যাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক আগেই কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের উদ্দেশ্যে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে ফারাক্কা অভিমুখে লাখো মানুষের লং মার্চ পরিচালনা করে তিনি বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন।

কেন তিনি আজও প্রাসঙ্গিক?

দুঃখের বিষয়, হাল আমলের অনেক রাজনীতিবিদই বাংলার এই মহান নেতাকে তেমন মনে রাখেননি। তাঁর নীতি ও আদর্শ আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপস্থিত। তবে বাংলাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে তাঁকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তাঁর রাজনৈতিক দল না থাকলেও, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর জন্য সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গাটি রয়েছে। তাঁর আদর্শ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হতে পারে— ক্ষমতা, অর্থবিত্ত বা প্রদর্শনী নয়, বরং সরলতা, ত্যাগ এবং গণমানুষের সাথে মিশে যাওয়াটাই আসল রাজনীতি। যারা এই মহান নেতা সম্পর্কে আরও জানতে চান, তাঁদের জন্য টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ঘুরে আসা এক নতুন অভিজ্ঞতা হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো এমন সাধারণ অথচ মহৎ নেতা বিরল। পাঁচ টাকার লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পরেই তিনি বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ— তিন যুগেই তিনি ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শীর্ষ নেতা। তাঁর সরল জীবনযাপন, নির্লোভ চরিত্র এবং সাধারণ মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা তাঁকে মহাত্মা গান্ধী, মাও সেতুং, উইনস্টন চার্চিল, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বিশ্বনেতাদের সাথে তুলনা এনে দিয়েছে।

আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন: [email protected]