ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের এক জটিল বিরোধ চলছে। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে মাত্র ৪৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও বর্তমানে এটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর্জেন্টিনা ঐতিহাসিকভাবে এই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উপর তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি করে আসছে এবং কেন তারা এই দাবি ছাড়তে চায় না, তা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।

ইতিহাসের সূচনা

এই বিরোধের মূল শুরু হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে। ১৫৯২ সালে ইংরেজ নাবিক জন ডেভিস প্রথমবারের মতো ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ফরাসি ও স্প্যানিশরা এখানে উপনিবেশ স্থাপন করে। ১৬৯০ সালের দিকে ব্রিটিশরাও এখানে আগমন করে এবং ফকল্যান্ড নামে দ্বীপের নামকরণ করে। তবে ফরাসিরা ১৭৬৪ সালে পূর্ব ফকল্যান্ডে উপনিবেশ স্থাপন করলেও, ব্রিটিশরা ১৭৬৫ সালে পশ্চিম ফকল্যান্ডে তাদের ঘাঁটি গাড়ে।

আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি

ইউরোপীয় পরাশক্তিদের ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতার মধ্যে স্প্যানিশরা ১৭৭০ সাল নাগাদ পশ্চিম ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে পরে ব্রিটিশরা তা পুনরুদ্ধার করে। পরবর্তীতে স্প্যানিশরা আর্জেন্টিনার মূল ভূখণ্ডে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং পূর্ব ফকল্যান্ডেও একটি ঘাঁটি গড়ে তোলে। ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার যুদ্ধের পর স্পেন পূর্ব ফকল্যান্ড থেকে নিজেদের ঘাঁটি সরিয়ে নিলে, স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনা গোটা ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। ১৮২০ সালের পর আর্জেন্টিনা এই দ্বীপটিকে নিজেদের মতো গুছিয়ে নিতে শুরু করে এবং আর্জেন্টাইন নাগরিকদের সেখানে নিয়ে এসে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশরা বিনা যুদ্ধেই ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং আর্জেন্টাইন নাগরিকদের বিতাড়িত করে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণ

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে আর্জেন্টিনা একটি চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিল এবং সামরিক জান্তা সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ডো গালতিয়ারি জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মনে করেছিলেন যে ১২,০০০ কিলোমিটার দূর থেকে দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে টিকতে পারবে না। এর ফলস্বরূপ, ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে সামরিক অভিযান চালায়, যা ব্রিটিশ সরকারকে হতবাক করে দেয়।

যুদ্ধের বিবরণ ও ফলাফল

আর্জেন্টিনার আকস্মিক আক্রমণের মুখে ফকল্যান্ডে থাকা ব্রিটিশ সেনারা কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। তবে ব্রিটেনও সহজে হার মানতে রাজি ছিল না। ১৯৮২ সালের ২ মার্চ ব্রিটেন তাদের নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী এবং গ্রাউন্ড অপারেশনের সব প্রস্তুতি নিয়ে ফকল্যান্ডে পৌঁছায়। ব্রিটিশ নৌবাহিনী দ্বীপপুঞ্জকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং বিমান বাহিনীর সহায়তায় শক্তিশালী গ্রাউন্ড অপারেশন শুরু করে। এ যুদ্ধে ব্রিটেনের সাবমেরিন ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ত্রিমুখী আক্রমণে আর্জেন্টাইন সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। ১৯৮২ সালের ১৪ জুন প্রায় ১০,০০০ আর্জেন্টাইন সেনা ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই যুদ্ধে অন্তত ৬৫০ জন আর্জেন্টাইন সেনা প্রাণ হারায়, যেখানে ব্রিটিশদের নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫৫ জন। এছাড়াও অনেক সমরাস্ত্র ধ্বংস হয়েছিল, যার মধ্যে আর্জেন্টিনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি।

যুদ্ধ পরবর্তী সম্পর্ক

ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ ছিল। ২০০০ সালের পর উভয় দেশই সম্পর্ক উন্নয়নে সক্রিয় হয়, কিন্তু ২০০৭ সালের পর ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেস ডি কির্চনার আর্জেন্টিনার সরকার প্রধান হলে আবার সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোটার ব্রিটেনের সাথে থাকার পক্ষে ভোট দেয়। ২০১৫ সালে মরিসিও ম্যাকরি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনের সাথে ফকল্যান্ড বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি চুক্তিতে পৌঁছান, যা কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে ২০২৩ সালে আর্জেন্টিনা সেই চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে আবার দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়।

আর্জেন্টিনার অবিচল অবস্থান

বর্তমানে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এর নিজস্ব সংবিধান রয়েছে। তবে আর্জেন্টিনা এখনও ফকল্যান্ডের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে নানান চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় নিরাপত্তা, ঐতিহাসিক অধিকার এবং সম্ভাব্য তেল-গ্যাস সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের কারণে আর্জেন্টিনা এই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের দাবি ছাড়তে চায় না। বিভিন্ন সময়ে আর্জেন্টিনা সরকারের দেয়া বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ফকল্যান্ডের মালিকানা ফিরে পাওয়ার আশা তাদের মধ্যে এখনও প্রবল। তাই ফকল্যান্ড নিয়ে দুই দেশের এই বিরোধ এত সহজে মিটছে না।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (Malvinas Islands) নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের দ্বন্দ্ব কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এই ছোট দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি হলেও বর্তমানে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। আর্জেন্টিনা মনে করে, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে ফকল্যান্ড দ্বীপ তাদেরই অংশ, যা ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন জোরপূর্বক দখল করে নেয়। অন্যদিকে ব্রিটেন দাবি করে, দ্বীপের বর্তমান বাসিন্দারা ব্রিটিশ শাসনেই থাকতে চায়। এই বিরোধ থেকেই ১৯৮২ সালে রক্তক্ষয়ী ফকল্যান্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার পরও আর্জেন্টিনা তাদের দাবি কখনো প্রত্যাহার করেনি। এই ভিডিওতে আমরা বিশ্লেষণ করেছি—আর্জেন্টিনা কেন আজও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের দাবি ছাড়তে চায় না। এটি কি শুধুই জাতীয় আবেগ ও ইতিহাসের প্রশ্ন, নাকি এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত অবস্থান, সামরিক নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য তেল-গ্যাস সম্পদের মতো বড় স্বার্থ? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং আধুনিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ফকল্যান্ড ইস্যু কেন আবারও আলোচনায় ফিরছে, সেটাও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন: