২২ বছর পর অবশেষে ফিরে আসা হলো টেলিফিল্ম ‘বৈরাতী’র সেই চেনা শুটিং লোকেশনে। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর দক্ষিণ বাগ গ্রামে ২০০৩ সালে এই টেলিফিল্মের চিত্রায়ন হয়েছিল। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও গ্রামটিকে আবারও দেখতে পাওয়ার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই সফর শুরু করেছিলাম।

বিয়ানীবাজার থেকে শুরু করে চন্দরপুরের ওপর দিয়ে কুশিয়ারা নদী পার হয়ে গোলাপগঞ্জ অঞ্চলে পৌঁছাই। সেখান থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত সেই কাঙ্ক্ষিত ভাদেশ্বর দক্ষিণ বাগ গ্রাম। ২০০৩ সালে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার টেলিফিল্ম ‘বৈরাতী’ নির্মাণের জন্য এই গ্রামটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল, কারণ এখানে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি এবং সম্ভ্রান্ত পরিবেশ বিদ্যমান ছিল।

গ্রামে প্রবেশ করতেই দেখা যায় এখনো কিছু ঐতিহ্যবাহী দালানকোঠা ছাড়া বাড়িগুলো অক্ষত আছে। টিলাময় এই অঞ্চলের ঘরবাড়িগুলো মূলত তিন স্তরের। একদম নিচে পুকুরঘাট, তার উপরে একটি মধ্যম স্তর যেখানে একটি টঙ্গিঘর থাকে, এবং সবচেয়ে উপরে মূল বাড়িটি। এই বাড়িগুলো প্রাকৃতিক প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত, যা পাহাড় বা টিলার অংশ কেটে তৈরি করা হয়েছে, যা অন্দরমহল ও বাহিরমহলের মধ্যে একটি সুন্দর পর্দা তৈরি করে।

পথে একজন স্থানীয় লোক, তাজউদ্দিন সাহেবের দেখা পাই। বৈরাতী টেলিফিল্মের শুটিংয়ের কথা শুনে তিনি তার দোকান বন্ধ করে আমাদের সাথে গাড়ি উঠে যান এবং বাড়িটি খুঁজতে সাহায্য করেন। আমরা খোঁজ নিতে নিতে শাবানা টিলা বা শ্রাবন্তী টিলার কথা জানতে পারি, যেখানে একবার নায়িকা শাবানা অভিনয় করেছিলেন এবং আমাদের নাটকের শ্রাবন্তী আছাড় খেয়ে মারা গিয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন। যদিও সেই টিলার এখন আর আগের রূপ নেই, পাশে ভবন উঠেছে।

মোকাম বাজার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে আমাদের সেই শুটিং স্পট। গ্রামটিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু পুরনো দিনের জমিদারদের আসামী স্টাইলের কিছু বাড়ি এখনো বিদ্যমান। পুকুর, পুকুরঘাট এবং বাড়ির তিন স্তরের বিন্যাস দেখে ২০০৩ সালের স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। যদিও আসল বাড়িটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি, তবে তেমনই আরেকটি বাড়িতে আমরা কিছুক্ষণের জন্য নামি, যেখানে একজন ভদ্রলোকের সাক্ষাৎ হয় যিনি সেই শুটিংয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং আমাদের গল্পের সাথে পরিচিত ছিলেন।

আসাম প্যাটার্নের বাড়িগুলো, যেখানে টঙ্গিঘর বা বৈঠকখানা থাকত, গ্রামের বিচার-আচার ও শালিশের জন্য ব্যবহৃত হতো। এসব বাড়ি এখন আর নতুন করে বানানো হয় না, তবে পুরনো বাড়িগুলো পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ধরে রাখতে এখনো টিকে আছে। বেশিরভাগ উত্তরাধিকারী এখন শহর বা বিদেশে বাস করলেও, বাড়িগুলো তাদের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। ২২ বছর পর এই স্মৃতিময় সফর শেষে তাজউদ্দিন সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আবার সিলেটের পথে রওনা দিই, বৈরাতীর স্মৃতি মাথায় নিয়ে।

২০০৩ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর দক্ষিণ বাগ গ্রামে টেলিফিল্ম “বৈরাতী” শুট করা হয়েছিল। সেই সময়ের লোকেশন, মানুষ, পরিবেশ আর স্মৃতিগুলো আজও মনে গেঁথে আছে।

২২ বছর পর, ২০২৫ সালের জুন মাসে আবার সেই গ্রামে ফিরে গিয়ে ক্যামেরাবন্দি করেছি বদলে যাওয়া আর না-বদলানো দৃশ্যগুলো—ঘরবাড়ি, পথঘাট, প্রকৃতি আর মানুষের মুখ।

এই ভিডিওতে দেখা যাবে—

  • ২০০৩ সালের শুটিং লোকেশনের বর্তমান অবস্থা
  • সময়ের সাথে বদলে যাওয়া গ্রামবাংলা
  • বৈরাতী টেলিফিল্মের স্মৃতিচারণ

আর পুরো টেলিফিল্ম বানানোর নেপথ্যগল্প আছে এই প্লে লিস্টে https://youtube.com/playlist?list=PLMQLf5M-c3BW2H2AAKZCV90RZyzCfNe7_&si=7gM3agjDFnT82hSH