বাংলাদেশের বগুড়ায় অবস্থিত মহাস্থানগড় কি সত্যিই বাংলার ৩০০০ বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক শহর? এই প্রাচীন নগরীর রহস্য ও এর সমৃদ্ধ ইতিহাস নিয়ে আজও চলছে গবেষণা। মৌর্য যুগে প্রতিষ্ঠিত এই পুন্ড্র নগরী ছিল তৎকালীন বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র। এখানে দুর্গ, প্রাসাদ, বাজার, রাস্তা সবই ছিল, এমনকি শহরতলীতেও বিভিন্ন স্থাপনা গড়া হয়েছিল।

প্রাচীন পুন্ড্র নগরীর কথা

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে, অর্থাৎ প্রায় ৩০০০ বছর আগেও বাংলাদেশে একটি আধুনিক ও সুপরিকল্পিত শহর ছিল – পুন্ড্র নগরী বা পুন্ড্রবর্ধন। মৌর্য বা তাম্রযুগে এই শহরই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরী। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত এটি ছিল এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রস্থল বা রাজধানী। নগর প্রাচীর, সুসজ্জিত ফটক, প্রাসাদ, সাধারণ বাসস্থান, সমাবেশস্থল, মন্দির, বিহার, দোকান, পুকুর এবং শহরতলীতেও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছিল পুন্ড্রনগরে।

করতোয়া নদীর তীরে পুন্ড্র জাতিগোষ্ঠীর বসতি স্থাপনের মাধ্যমে এই নগরীর গোড়াপত্তন হয়। পুন্ড্ররা কৃষিকাজ, হস্তশিল্প এবং রেশমের চাষ ও রেশমি কাপড় তৈরিতে খুবই পারদর্শী ছিলেন। বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশাল অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই পুন্ড্র নগরী।

ঐতিহাসিক নিদর্শন

ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়কে ঘিরে রয়েছে বহু মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এই স্থানে ধর্মপ্রচারে এসেছিলেন মহামতি গৌতম বুদ্ধ এবং জগৎবিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সানও এর অনুসন্ধানে ঘুরে গিয়েছেন। বর্তমানে দুর্গের ভেতরে বেশ কয়েকটি ঢিবি এবং কাঠামোগত ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • জিয়াত কুণ্ড
  • মানকালীর ধাপ
  • পরশুরামের বাসগৃহ
  • বৈরাগীর ভিটা
  • খোদার পাথর ভিটা
  • মনিরঘন

শহরটির চারদিকে চারটি প্রবেশপথ ছিল, যেমন উত্তরে কাটাদুয়ার, পূর্বে দোরাবশাহতরণ, দক্ষিণে বুড়ির ফটক এবং পশ্চিমে তামরা দারওয়াজা। মহাস্থানের চারপাশে আরও ৩১টি স্থাপনা ও ঢিবি রয়েছে, যা শহরতলীতে শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের বাসস্থান ছিল বলে ধারণা করা হয়।

রাজা পরশুরাম ও শাহ সুলতানের যুদ্ধ

মহাস্থানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো রাজা পরশুরাম ও শাহ সুলতান বলখী মাহেশাওয়ারের যুদ্ধের কাহিনী। এটি ১৩৪৩ থেকে ১৪০০ সালের মধ্যকার ঘটনা। আফগানিস্তানের বলখ এলাকা থেকে ইসলাম প্রচারে বগুড়ার এই অঞ্চলে আসা দরবেশ শাহ সুলতানের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মারা যান এখানকার রাজা পরশুরাম। তবে পৌরাণিক গল্পকাহিনীতে পরশুরামকে অমর বলা হয়েছে।

বর্তমান মহাস্থানগড়

পুরাতাত্ত্বিক এই জায়গাটি বর্তমানে বেশ জমজমাট। শাহ সুলতান বলখী মাহেশাওয়ারের মাজার ঘিরে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়, রীতিমতো মেলা বসে এখানে। দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ মাজারে মানত করতে আসেন, সিন্নি দেন এবং সারাদিন বসে প্রার্থনা করেন। এখানে অনেক দোকানে ঐতিহ্যবাহী কটকটি বিক্রি হয়, যা এই এলাকার একটি জনপ্রিয় অনুষঙ্গ। মোটকথা, প্রাচীন রাজ্যের মতোই অদ্ভুত নানা ধর্মীয় বিশ্বাস আর আবেগ নিয়ে আজও টিকে আছে ৩০০০ বছরের পুরনো এই মহাস্থানগড়।

মহাস্থানগড় কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, এটি বাংলার ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। এই ভিডিওতে আপনি তিন হাজার বছরের পুরনো পুন্ড্র নগরীর বাস্তব চিত্র, এর ইতিহাস, মিথ ও ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। কীভাবে আজও টিকে আছে এই প্রাচীন শহর, সে সম্পর্কেও ধারণা পাবেন। ভিডিও দেখে আপনার মতামত জানান!

যোগাযোগের জন্য: [email protected]