বাংলাদেশের মিষ্টান্ন জগতে বগুড়ার দই এক অনন্য নাম। প্রায় ১৫০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এই দই শুধু দেশের মানুষের কাছেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিচিতি লাভ করেছে। কালের বিবর্তনে এর উৎপাদন পদ্ধতি ও বাজারজাতকরণে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আজকের পোস্টে আমরা জানবো, কিভাবে শেরপুরের ঘোষপাড়ার হাতে তৈরি দই আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ৯০ কোটি টাকার এক বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে।

বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৫০ বছর আগে শেরপুরের ঘোষপাড়ায় বগুড়ার দই তৈরির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে প্রায় ১০০ বছর ধরে এটি সারা দেশে দাপটের সাথে ব্যবসা করেছে। বর্তমানে বগুড়া শহর জুড়ে এর অসংখ্য কারখানা ও দোকান রয়েছে। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার দই উৎপাদন হয় এবং বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিশেষ করে কোরবানীর ঈদের মৌসুমে এর বিক্রি দৈনিক ৫-৬ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ২০০৩ সালে এই দই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে, যা এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দিয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তিতে দই উৎপাদন

আগে বগুড়ার দই হাতে তৈরি হতো, যেখানে দই ঢালা থেকে তোলা পর্যন্ত সব কাজই ছিল হাতে। তবে এখন চাহিদা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি নজরদারির কারণে উৎপাদন পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তন। আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেলের মতো প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন যুগোপযোগী মেশিন ব্যবহার করে দই তৈরি করছে। প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয় এবং এরপর আধুনিক মেশিনে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দই পাতা হয়। এতে করে দইয়ের মান, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং ক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত অভিযোগও কমেছে।

বৈচিত্র্যময় দইয়ের প্রকারভেদ

আগে শুধু সরা পাতা ঘন মিষ্টি দই মিললেও, এখন বগুড়ার দই বাজারে নানা রূপে পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে:

  • মালাই দই
  • সর দই
  • চিনিপাতা দই
  • সাদা দই
  • টক দই
  • প্রিমিয়াম দই

এসব দইয়ের দাম প্রতি কেজি ১২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

দইয়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বগুড়ার দই শুধু স্বাদের জন্যই বিখ্যাত নয়, এর রয়েছে অসংখ্য স্বাস্থ্য উপকারিতা। এটি হজম শক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। দইয়ে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও মিনারেল বিদ্যমান। বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ দই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি টাকার বগুড়ার দই দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

বগুড়ার দই শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি বাংলাদেশের এক অমূল্য ঐতিহ্য। ২০২৩ সালে এটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে, যা এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে। আপনার মতামত জানাতে পারেন [email protected] ঠিকানায়।