৪২ বছর আগে অভাবী মুক্তার মিয়া দেশ ছাড়েন, যখন তার কোনো কাজই জানা ছিল না। লেখাপড়াও খুব বেশি ছিল না তার। মাথায় ছিল শুধু একটি চিন্তা – পরিবার বাঁচাতে হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রুক্ষ মরুর দেশে এসে যেন বিপদ আরও বাড়লো। ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার-দাবার, সবকিছুই ছিল অপরিচিত। তবে দীর্ঘ ৪২ বছরের সংগ্রাম আর সাধনার পর অবশেষে সুখ পেলেন মুক্তার মিয়া। তার দুই কন্যার অসাধারণ সাফল্যে তিনি এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাঙালি কমিউনিটিতে এক উদাহরণ।

প্রবাস জীবনের শুরু ও সংগ্রাম

১৯৮১ সালে মুক্তার মিয়া এসেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। প্রথমে কিছুদিন দর্জির কাজ করেন, এরপর পান গাড়িচালকের চাকরি। আমিরাত সরকারের রোড ট্রান্সপোর্ট দপ্তরে প্রায় ৩০ বছর ধরে সততার সাথে কাজ করেছেন তিনি। শুরুতে তার জীবন ছিল অনেক কষ্টের। নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটি হোটেলও দিয়েছিলেন মুসাফিতে, কিন্তু তা ধরে রাখতে পারেননি। ভাইদের এনেছিলেন আমিরাতে, তারাও তার কাছে থাকেনি। এসব নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও, তার লক্ষ্য ছিল স্থির – পরিবারকে একটি ভালো জীবন দেওয়া।

মেয়েরা বদলে দিল ভাগ্য

মুক্তার মিয়ার দুই কন্যা প্রমী এবং হিমি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। অসাধারণ মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে তারা স্কুলে অবিশ্বাস্য ভালো ফল করেছেন। তাদের এই সাফল্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার তাদের ১০ বছর মেয়াদী গোল্ডেন রেসিডেন্সি প্রদান করেছে, যা প্রবাসী পরিবারে এক নজিরবিহীন ঘটনা। মেয়েদের এই সম্মানজনক স্বীকৃতি মুক্তার মিয়াকে এখন রীতিমত সেলিব্রেটিতে পরিণত করেছে। আরবীয়, ভারতীয় সহ সকলেই তাকে সম্মান করে এবং কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়। তার মেয়েরা এখন মেডিকেলে পড়ছেন, স্কলারশিপের মাধ্যমে তাদের পড়াশোনার খরচ চলছে।

লোভহীন জীবন ও পুরস্কার

মুক্তার মিয়া একটি লোভহীন, সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। অর্থবিত্তের পেছনে না ছুটে তিনি কাজ ও পেশার প্রতি সৎ থেকেছেন। তার চাকরিকালীন সময়ে প্রায় ৩০ বছরে তার নামে কোনো অভিযোগ নেই। তিনি কখনো কাজে পৌঁছাতে দেরি করেননি। তার এই সততা ও নিষ্ঠার জন্য আমিরাতের সরকারি দপ্তর তাকে পুরস্কৃত করেছে। তিনি মেডেল ও সনদ পেয়েছেন এবং একটি গাড়িও উপহার হিসেবে পেয়েছেন। নিজের শেষ জীবনে মেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ করাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য।

জীবনের আসল সুখ কোথায়?

পাহাড়ের কোলে ফুজাইরার আল গাদিব গ্রামে ভাড়া করা একটি বাড়িতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে মুক্তার মিয়ার সুখের সংসার। বাগান, সবজি চাষ, এমনকি হাঁস-মুরগির ছোট খামারও আছে তার। অবসর জীবনে তিনি নিজের হাতে ঘরের কাজ করেন এবং খামার সামলান। মুক্তার মিয়া বিশ্বাস করেন, সুখ মানে টাকাপয়সা বা অর্থবিত্ত নয়, বরং চাহিদা কম রাখা, সন্তানের সাফল্য দেখা এবং নিজের সততার সাথে জীবন কাটানো। তার পরিবারের কারোরই বাড়তি কোনো চাহিদা নেই, যা আছে তাতেই সবাই খুশি। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ এবং পরিতৃপ্তি। তিনি চান তার মেয়েরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে এবং নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রবাসের জীবন মানেই সংগ্রাম, কিন্তু মুক্তার মিয়া ৪২ বছর আগে অভাবের তাড়নায় দেশ ছাড়লেও আজ সন্তানের চোখে তিনি একজন নায়ক। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গাড়িচালক হিসেবে তার যাত্রা শুরু হলেও, তার দুই মেয়ে প্রমী ও হিমি অর্জন করেছেন আরব আমিরাত সরকারের গোল্ডেন রেসিডেন্সি, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক বিশাল সম্মান। এই গল্প প্রমাণ করে সুখ মানে শুধু টাকাপয়সা নয়, বরং সন্তানের সাফল্য আর নিজের সততা।

আপনার কাছে এমন প্রবাসী বা অনুপ্রেরণামূলক গল্প থাকলে পাঠাতে পারেন: [email protected]