আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ প্রদেশের মাসাফিতে অবস্থিত ফ্রাইডে মার্কেট, যা মরুভূমির মাঝে এক আশ্চর্য বাজার হিসেবে পরিচিত, সেখানে বাংলাদেশীরা নিজেদের এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন। এই বাজারে এমন সব জিনিসপত্র বিক্রি হয়, যা আরবরা বিশ্বাস করেন শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে, এখানে পাওয়া যায় ‘হিব’ নামক একটি দুর্লভ খাবার, যা শক্তি বাড়ানোর জন্য খুবই জনপ্রিয়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও বাংলাদেশীরা এখানে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
ফ্রাইডে মার্কেট কী?
দুবাই ও ফুজাইরার মাঝখানে, মরুভূমি আর পাহাড়ের কোলে গড়ে উঠেছে এই অদ্ভুত বাজার, যার নাম ফ্রাইডে মার্কেট। গরমকালে এখানকার তাপমাত্রা প্রায় ৫০-৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যায়। এই প্রতিকূল পরিবেশেও খোলা আকাশের নিচে ছাউনি দিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে থাকেন বিক্রেতারা। হরেক রকম পণ্য এখানে সাজানো থাকে, যা স্থানীয় আরবীয়দের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। যদিও এর নাম ফ্রাইডে মার্কেট, তবে এখন এটি প্রতিদিনই খোলা থাকে এবং জমজমাট থাকে।
কেন বাংলাদেশীরা এখানে?
এই বাজারের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এর বেশিরভাগ দোকানের মালিক ও ব্যবসায়ী বাংলাদেশীরা। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০% এর বাড়ি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। প্রায় ৪০ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুয়াজ্জেম নামে একজন এই বাজারে একটি ছোট দোকান শুরু করেছিলেন। শুরুতে তিনি খেজুর, মধু ও ফলমূল বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে তার দোকানের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং একসময় এটি একটি বড় বাজারে পরিণত হয়। মুয়াজ্জেমের হাত ধরে শুরু হওয়া এই বাজার এখন শতাধিক বাংলাদেশি দোকানের এক বিশাল শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রবাসীরা নিজেদের এক শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন।
শক্তিবর্ধক খাবার হিব
ফ্রাইডে মার্কেটের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘হিব’ নামক এক বিশেষ শক্তিবর্ধক খাবার। এটি খেজুর গাছের মাথার অংশ কেটে ভেতর থেকে বের করা হয়। স্থানীয় আরবরা এই জিনিসটি খুব পছন্দ করে কারণ তাদের বিশ্বাস এটি শারীরিক শক্তি বাড়াতে বিশেষ সহায়ক। এটি সাধারণত পিস হিসেবে বিক্রি হয় এবং এর দামও বেশ চড়া। একটি ছোট পিসের দাম প্রায় ৩০ দিরহাম, যা বাংলাদেশী টাকায় অনেক। প্রচণ্ড গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে এটি বরফ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়। শুধু আরবরা নয়, এখন অনেক বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও মিশরীয়রাও এই হিব কেনেন।
অন্যান্য পণ্য ও ব্যবসায়িক বৈচিত্র্য
ফ্রাইডে মার্কেটে হিব ছাড়াও আরও অনেক অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় পণ্য পাওয়া যায়। এখানে বোতলজাত লেবুর কড়া জুস, কচি নারকেলের শ্বাস, ভুট্টার ছড়া, মিশর, ইয়েমেন, ইরান ও ওমান সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হরেক রকমের ফল, লতা ও গুল্ম বিক্রি হয়। এমনকি বাংলাদেশের কাঁচাপাকা আম, আনারস, আমরা, পেয়ারা ও আমলকিও এখানে পাওয়া যায়। অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা শুরুতে দোকানে কর্মচারী ছিলেন, এখন তারা নিজেরাই আশেপাশে খামার লিজ নিয়ে খেজুর, ফল ও সবজি ফলাচ্ছেন এবং পাইকারিভাবে বিক্রি করছেন। বাজারের একপাশে ইয়ামেন ওমান সৌদি আরব থেকে আসা বিশেষ ধরনের মধুর দোকানও রয়েছে, যার এক কেজির দাম বাংলাদেশী মুদ্রায় লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ভ্রাতৃত্ব ও সফলতার গল্প
ফুজাইরার এই ফ্রাইডে মার্কেটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রবাসীরা একজোট হয়ে কাজ করেন। তাদের মধ্যে এক শক্তিশালী ভ্রাতৃত্ববোধ রয়েছে। এখানে এসে কোনো আরবীয় বা ভারতীয় সহজে ঝামেলা করে পার পায় না, কারণ ব্যবসায়ীরা সবাই মিলেমিশে থাকেন। অনেকেই নিজের আত্মীয়স্বজনদের এনে কাজ দিয়েছেন এবং তাদের কমিউনিটিকে আরও মজবুত করেছেন। এই দূর প্রবাসে তারা শুধু ব্যবসা করছেন না, বরং নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রেখে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।
দুবাই ও ফুজাইরার মাঝখানে মরুভূমির কোলে গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত বাজার — ‘ফ্রাইডে মার্কেট’। এখানে বিক্রি হয় এমন সব জিনিস যা আরবরা মনে করেন “শক্তি বাড়ায়”। গরমে যখন তাপমাত্রা ছোঁয় ৫০/৫৫ ডিগ্রি, তখনও খোলা বাজারে বসে বাংলাদেশিরা দোকান সাজিয়ে বিক্রি করছেন ‘হিব’ নামের বিশেষ খাবার, মধু, খেজুর, ফল, লতা-গুল্ম, আর নানা শক্তিবর্ধক উপকরণ। এই বাজারের ইতিহাসও রোমাঞ্চকর — শুরু করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোয়াজ্জেম নামের এক প্রবাসী, আর আজ সেটি হয়ে উঠেছে শতাধিক দোকানের এক বাংলাদেশি শক্ত ঘাঁটি।
যোগাযোগ: [email protected]

Leave a Reply