গাজীপুরের শান্ত সবুজ গ্রামে অবস্থিত একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে মানুষের মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে: এটি কি কোনো ফ্যাক্টরি, নাকি একটি বিলাসবহুল ফাইভ স্টার হোটেল? সিলভার লাইন গ্রুপ এর অত্যাধুনিক টেক্সটাইল কারখানাটি এমনই এক বিস্ময়, যা বাংলাদেশের শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এখানে শুধু পোশাক তৈরি হয় না, তৈরি হয় বিশ্বমানের পণ্য, যা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কে গর্বের সাথে উপস্থাপন করে।

সিলভার লাইন গ্রুপের তাক লাগানো কারখানা

প্রায় ১০০ একর জমিতে বিস্তৃত এই কারখানাটি গ্রামের ভেতর চমৎকার সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেরা। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো সুন্দর পার্ক। দীর্ঘ হাঁটার পথ, সুসজ্জিত ফুলবাগান আর ফোয়ারা নিয়ে এর পরিবেশ এতটাই মনোরম যে, যে কেউ প্রথমবার এখানে এসে মুগ্ধ হবেন। এটি সত্যিই একটি ফ্যাক্টরি নাকি কোনো দর্শনীয় স্থান, তা বোঝা মুশকিল। প্রতিষ্ঠানের মালিক অত্যন্ত সৌখিন এবং খুঁতখুঁতে হওয়ায় পুরো কম্পোজিট কারখানাটিকে তিনি নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছেন, যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

আবাসন ও কর্মপরিবেশ

গাজীপুরের তালতলি গ্রামে অবস্থিত এই কারখানা সিলভার লাইন গ্রুপের একটি তাক লাগানো প্রতিষ্ঠান। ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে নজরে পড়বে মার্বেল লাগানো সারি সারি কয়েকটি ভবন, যেখানে কারখানার কর্মকর্তারা থাকেন। এমনকি বিদেশি অতিথিদের জন্য তারকামানের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে এই কম্পাউন্ডের ভেতরে। কর্মীদের থাকার জন্যও আছে আলাদা কমপ্লেক্স, যা একটি উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে। কারখানা কম্পাউন্ডটি টেক্সটাইল, স্পিনিং এবং গার্মেন্টস—এই তিনটি ব্লকে ভাগ করা।

আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন স্টুডিও

আমাদের অবাক করে দিয়ে দেখা গেল যে, টেক্সটাইল কারখানার উপরেই একটি ফ্লোর জুড়ে করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ফ্যাশন স্টুডিও। এখানে বিশ্বের নামকরা নানা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাকের ডিজাইন তৈরি করছেন দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা, যাদের মধ্যে ইতালি ও আমেরিকার ফ্যাশন এক্সপার্টরাও রয়েছেন। গ্রামের এই পরিবেশে বসে তারা যেসব পোশাকের নকশা করেন, তাই পরে গিয়ে ওঠে লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্কের ব্র্যান্ড শোরুমে। ক্রেতারা অবাক হয়ে সেসব কেনেন। কারণ এখানে “Different kind of finish, handfeel and other things” এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়াও, মৌসুমী প্রভাব, আবহাওয়াগত প্রভাব এবং বাজারে সঠিক সময়ে পণ্য আনার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মাথায় রেখে এখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সিলভার লাইন আজ বিশ্বের বড় বড় রিটেইলার ও ব্র্যান্ডের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। আগামী দুই-তিন বছর পর পোশাকের বিশ্ববাজার কোথায় থাকবে, তার ডিজাইন এখনই তৈরি হচ্ছে সিলভার লাইনের ফ্যাশন স্টুডিওতে, যা বায়ারদের কাছে পাঠানো হচ্ছে যাতে এক বছর আগেই চাহিদার মালামাল তৈরি হয়ে থাকে।

মেড ইন বাংলাদেশ: বিশ্বজুড়ে গর্বের প্রতীক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা যখন ঘুরতে যাই, বিশেষ করে ব্র্যান্ড শপগুলোতে কেনাকাটা করতে গেলে, তখন যদি কেউ ‘বাংলাদেশী’ শোনে, ওই শপের সেলসম্যান কিংবা অন্য কেউ আমাদের ‘হ্যালো বাংলাদেশ’ বলে। এর কারণ হলো, আমরা বাংলাদেশ তাদের কাছে পরিচিত আমাদের গার্মেন্টস পণ্য দিয়ে। বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে বড় বড় ব্র্যান্ড শপ বা কোম্পানি যে উচ্চ মূল্যের বিলাসী পণ্য বিক্রি করছে, তা কিন্তু তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের এমন গ্রামের ফ্যাক্টরিতে, আমাদের বাংলাদেশিদের হাতে। আর এই সকল পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানই পণ্যের মূল ভ্যালু বা দাম তৈরি করে দিচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশিদের রক্ত-ঘাম, পরিশ্রম এবং মেধার বিকাশ রয়েছে। এইরকম একটি কারখানায় প্রতি বছর এত পরিমাণ পণ্য তৈরি হলে তা শুধু একটি দেশে নয়, বিশ্বের বহু দেশেই ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং দেশকে মেড ইন বাংলাদেশ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা

টেক্সটাইল সেকশনটিতে ঘুরতে গেলে লম্বা সময় লাগে। একেকটি ইউনিট ফুটবল খেলার মাঠের চেয়েও বড়, যেখানে পায়ে হেঁটে এপার থেকে ওপারে যাওয়াও কষ্টকর। নিখুঁত কাপড় বুনতে এবং বায়ারদের নজর কাড়তে সিলভার গ্রুপের এই কারখানায় মেশিন আনা হয়েছে জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা থেকে। এসব মেশিন শব্দ কম করে, পরিবেশবান্ধব এবং উৎপাদন ক্ষমতাও বেশি। মালিক সেলিম স্যার কোন কিছুতে কার্পণ্য করেননি; যখন যে ইন্ডাস্ট্রি বা প্ল্যান তৈরি করেছেন, তখনকার সবচেয়ে আধুনিক মেশিন ও প্রযুক্তি এখানে নিয়ে এসেছেন। ইউএসএ-এর প্রথম সারির পাঁচটি ব্র্যান্ড, যেমন – ম্যানফিস, জেসিপেনি, লিভাইস, আমেরিকান ইগল, লরেন, কসকো, টার্গেট, সবই সিলভার লাইনের সরাসরি নমিনেশন। এখানকার ফ্যাব্রিক যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া, এমনকি টেক্সটাইলের জন্য পরিচিত দেশ চায়নাতেও।

সফলতার পেছনে মানুষের অবদান

এই শিল্প অঞ্চলটির মালিক বাগেরহাটের এমএইচ সেলিম। তিনি সপ্তাহে তিন-চার দিন কারখানার মধ্যেই থাকেন এবং ঘুরে ঘুরে উৎপাদন দেখেন। তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেই ভুল শুধরে দেন। তার উপস্থিতিতে সব কর্মী সজাগ ও সতর্ক থাকেন, ফলে উৎপাদনও বেশি হয় এবং মানও ভালো থাকে। কারখানা কম্পাউন্ডের ভেতরেই সবার জন্য আলাদা আবাসন আছে, তেমনি মালিক এমএইচ সেলিমেরও থাকার জায়গা আছে। তিনি বলেন, কর্মীদের সাথে কাজ শেয়ার করে তিনি নিজেও তৃপ্ত এবং এটি তার অনেক ভালো লাগে।

একটি ওয়ান-স্টপ মলের মতো প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যদি কোনো গার্মেন্টস এখানে অর্ডার দেয়, তবে তারা ভার্টিক্যালি কাজ করার সুবিধা পায়, অর্থাৎ সুতা ও কাপড় সবই এখানে তৈরি হয়। এতে একটি আলাদা বেনিফিট পাওয়া যায়; কম রেট দিলেও তিনটি ধাপে কিছু না কিছু লাভ আসে, ফলে লাভ ভালো থাকে। তাদের গার্মেন্টস অনেক বড়, প্রায় ৬২ লাইনের ওপেন গার্মেন্টস। নিট নয়, এটি একটি ওপেন ফ্যাক্টরি, যা তৈরি করতে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা লাগে। নিট ফ্যাক্টরি করতে গেলে হয়তো দুই-তিনশ কোটি টাকায় হয়ে যায়।

সিলভার গ্রুপের কর্মপরিধি ও ভবিষ্যৎ

সিলভার গ্রুপের এই শিল্পপল্লীতে স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শাখায় বিভিন্ন ইউনিটে অন্তত ৩০০ মেশিনারি আছে এবং কাজ করছেন প্রায় ১০০০০ কর্মী। দুই যুগ আগে শুধু স্পিনিং শাখা চালু ছিল, ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় সবই এক বাউন্ডারির মধ্যে করা হয়েছে। মানে এখানে তুলা এসে ঢোকে আর তা বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও কোম্পানির তৈরি পোশাক হয়ে বের হয়ে যায়। তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড়, সেই কাপড়ের রং, প্রিন্ট, ধোলাই, সেলাই, প্রসেসিং, প্যাকিং — সবই হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে, যা সাধারণত অন্যান্য ফ্যাক্টরিগুলোতে দেখা যায় না। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাপড়ও রপ্তানি করছে তারা।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সরকারের ভূমিকা

সাম্প্রতিক কিছু সমস্যা দেশ প্রসিদ্ধ এই শিল্প গ্রুপকে বিপদে ফেলেছে। যেমন, স্পিনিং মিল ও টেক্সটাইল মিল নিয়ে তারা খুব বিব্রত অবস্থায় আছেন। ব্যাংকের ইন্টারেস্ট ৯% থেকে বাড়িয়ে ১৪% করা হয়েছে। সুতা বা তুলার জন্য এলসি (Letter of Credit) খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা সময়মতো পাওয়া যায় না। কাপড় বানাতে গেলে শুধু নিজেদের মিলের সুতা যথেষ্ট নয়, বিভিন্ন টাইপের সুতা ইম্পোর্ট করতে হয়, যেমন ভিয়েতনাম, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড থেকে। বড় ব্র্যান্ডের চাহিদা পূরণ করতে গেলে এসব সুতা আমদানি অপরিহার্য, কিন্তু এলসি দেওয়া হয় না। তবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক তাদের কিছু সাপোর্ট দিয়েছে, যার ফলে অন্তত ৪০-৬০% প্রোডাকশন তারা চালিয়ে যেতে পারছেন। অন্যদিকে, এফএসসি ব্যাংক থেকে গত দুই বছর ধরে কোনো সাপোর্টই পাননি।

তবে এক্সপোর্ট সামনে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। আমেরিকান অর্ডার প্রচুর পরিমাণে বাংলাদেশে ঢুকছে, যা আগে ইন্ডিয়াতে যেত। ইন্ডিয়া ও চায়না ৫০% ট্যাক্স করায় এখন সেখান থেকে অর্ডার বাংলাদেশে আসছে। চায়না ও ইন্ডিয়ান কোম্পানিগুলোও বাংলাদেশে গার্মেন্টস করার চেষ্টা করছে, যা বাংলাদেশের গার্মেন্টস ব্যবসাকে আরও ভালো করবে। সিলভার গ্রুপ ব্রাজিল, জাপান-এর মতো নতুন মার্কেট করার চেষ্টা করছে, যেখানে ইনসেন্টিভও দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশে ফরেন কারেন্সি আনা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইনসেন্টিভ পাওয়া যাচ্ছে না, বরং বিভিন্নভাবে আরও নেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘ ৪০ বছরের পথচলা ও গবেষণা

আসলে চেষ্টা থেকেই অনেক কিছু হয়। সিলভার গ্রুপ রাতারাতি এত বড় প্রতিষ্ঠান বা বিশাল কারখানা গড়েনি। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিলে তিলে এটি গড়া হয়েছে। গাজীপুরের হোতাপাড়া, পিরুজালী সহ এই এলাকার বহু কারখানা শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের কারণে গেল কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু সিলভার লাইনের কোন কারখানায় তা হয়নি। আমরা যা ঘুরে দেখলাম, সেখানে প্রতি বছর এমন বহু পণ্য তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে নতুনত্ব, অভিনবত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির মিশ্রণ আছে। পণ্য তৈরি করার সময় তারা ভবিষ্যতের দিন, বাজার, আবহাওয়া, মানুষের রুচি এবং দাম কেমন হবে, এসব শত শত চিন্তাভাবনা সামনে আনছেন। তাই কি আমরা বলতে পারি না যে এটি একটি গবেষণা বা বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনা? বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের এই প্রযুক্তি এবং সম্ভাবনাকেই নতুন করে আগামীর দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছে এই সকল কারখানাগুলো। আর তাই তাদের জন্য আমাদের এমন ইতিবাচক ধারণা নিয়েই এগিয়ে যাওয়া উচিত।

আমরা আশা করব যে, আমাদের সরকারি ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার সাথে এ সকল মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকেও একটি বড় অংশ হিসেবে কাজে লাগানো হবে। এই কারখানার কর্মীরাও সেই মর্যাদা পান। বছরে তাদের নিয়ে কারখানা চত্বরে জমকালো উৎসব হয়, যেখানে সোনার গহনা, মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন সহ হাজারো উপহার থাকে কর্মীদের জন্য। খাওয়া-দাওয়া তো আছেই। এ যেন নিজস্ব এক জগৎ এক কারখানা পল্লীতে, যেখানে কাজের পাশাপাশি পরিবেশ ও সম্পর্ককে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাইতো বিদেশি ক্রেতা যারাই এখানে আসেন, তারাই হাসি মুখে সবার সাথে মেশেন এবং খুশি হয়ে পণ্য কেনেন। এটাই তো আসল মেড ইন বাংলাদেশ, আমাদের যে গর্ব বিশ্বজুড়ে।

গাজীপুরের গ্রামে সিলভার লাইন গ্রুপের এই টেক্সটাইল কারখানাটি দেখলে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না যে এটি একটি কারখানা নাকি একটি ফাইভ স্টার হোটেল। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কিভাবে বিশ্বের বাজারে গর্বের প্রতীক হচ্ছে, তা এই ভিডিওতে দেখুন। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে আরও অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও দেখতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন।

যোগাযোগ: [email protected]