২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর, ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট এক ভয়াবহ সুনামি ১৪টি দেশের ওপর আঘাত হেনেছিল, যার ভয়াবহতা ছিল কল্পনাতীত। সেদিনের সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় দুই লাখ তিন হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। সাগরের ১০০ ফুট উঁচু ঢেউ তীরের ৩২টি শহরকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কলম্বো শহর কি সাগরে ডুবে যেতে পারে? এই প্রশ্নটি এখন শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর সাত লাখেরও বেশি মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে শহরটি এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
সেই সুনামির আঘাতে শ্রীলঙ্কাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে রাজধানী কলম্বো থেকে গালে যাওয়ার পথে একটি ট্রেন সমুদ্রে ভেসে গিয়েছিল, যেখানে এক হাজারেরও বেশি যাত্রী মারা যান। যদিও সেবার কলম্বো শহর সরাসরি বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়নি, তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, যেভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, তাতে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে কলম্বো শহরের অর্ধেকেরও বেশি অংশ সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যেতে পারে।
২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামি
২০০৪ সালের সেই প্রলয়ংকরী সুনামি, যা ‘বক্সিং ডে’ সুনামি নামে পরিচিত, প্রকৃতি যেন এক মুহূর্তে আমাদের এই অঞ্চলের অন্তত ১৪টি দেশকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। ভারত মহাসাগরের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট এই সুনামি ১৪টি দেশে আঘাত হেনেছিল এবং মারা গিয়েছিল ২ লাখ ৩ হাজার মানুষ। এই ভয়াবহ দুর্যোগে শ্রীলঙ্কাও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছিল। সেবার রাজধানী কলম্বো শহর বড় ধরনের দুর্যোগ টের না পেলেও, কলম্বো থেকে গালে যাবার পথে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনকে সুনামি উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে ট্রেনের ১০০০ এরও বেশি যাত্রী প্রাণ হারান। ২০০৪ সালের ওই সুনামিতে শ্রীলঙ্কায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০০ এর বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও কলম্বোর বিপদ
জলবায়ুর পরিবর্তন এবং সাগরের উচ্চতা বাড়ার ফলে এখন কলম্বো শহরকে ঘিরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখা দিয়েছে। ভারত মহাসাগর ঘিরে রাখা এই শহরে সাত লাখেরও বেশি মানুষ বাস করেন। শহরটি যেন মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত এবং সাগরই এর জীবনরেখা। সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে রেললাইন, স্কাইলাইন, শত শত ভবন, স্থাপনা, হোটেল-মোডেল। ফেনাতোলা ঢেউ এসে ক্রমাগত আঘাত হানছে তীরে। যদিও এখন ঢেউগুলো ১০-১২ ফুট উঁচু হয়, কিন্তু উত্তাল সময়ে এই ঢেউই ৩০-৪০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে কলম্বো শহরের ৫০ তলা ভবন, আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। কিন্তু দ্রুতগতিতে কলম্বো শহরের সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, যেখানে আধুনিকায়ন ও রুচিশীল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে গণপরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং নগর সজ্জার ক্ষেত্রে।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের এই ঝুঁকির মধ্যেও দেশটির বর্তমান সরকার কলম্বো শহরকে বাঁচাতে এবং সাজানোর চেষ্টা করছে। সাগরের তীর ধরে যত স্থাপনা হচ্ছে, তার সবগুলোকেই ভূমিকম্প ও সুনামি সহনীয় করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় তাদের কর্মসূচিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরদার।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ
জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনে পৃথিবীর যে ১০টি দেশ বড় ঝুঁকিতে আছে, তার মধ্যে অন্যতম শ্রীলঙ্কা। মহাসাগর তীরের এই দ্বীপ দেশটির বর্তমান সবচেয়ে বড় বসতি রাজধানী শহর কলম্বো, যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস করেন। এটি তাদের অর্থনীতিরও প্রাণকেন্দ্র; প্রতিবছর অন্তত ২৫ লাখ পর্যটক এই শহরে ঘুরতে আসেন। কিন্তু এখানেই এখন ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবছর দুই থেকে আড়াই মিলিমিটার বাড়ছে সাগর মহাসাগরের পানির উচ্চতা। এভাবে বাড়তে থাকলে ৫০ বছরের মধ্যে কলম্বো শহরের অর্ধেকেরও বেশি ডুবে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা ও জলবায়ু গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, তখন শহরের নতুন এই অংশ অকেজো হয়ে যেতে পারে।
শ্রীলঙ্কার পদক্ষেপ ও আমাদের শিক্ষা
যদিও বড় সুনামি বা জলোচ্ছাস ছাড়া এখন কলম্বো শহরের তেমন কোনো ঝুঁকি নেই, তবে একটা কথা সত্যি: জলবায়ুর লাগাতার পরিবর্তন এমন ঝুঁকি এনে দিয়েছে। শুধু শ্রীলঙ্কাই নয়, আমাদের দক্ষিণাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মানুষদের জন্যও এটি এক সতর্ক বার্তা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ওইসব এলাকায় প্রতিবছর অন্তত ১০ লাখ মানুষ উদ্বাস্ত হচ্ছেন, যেখানে শ্রীলঙ্কায় এই সংখ্যা মাত্র ২০,০০০। তাদের অবশ্য সরকারিভাবে নানা সহযোগিতা দেয়া হয়।
এই গল্পের উদ্দেশ্য হলো, আমরা যতই নিজেদের সতর্ক ও সজাগ করি না কেন, প্রকৃতি আমাদের ছাড়বে না। প্রকৃতির কোনো কিছুই আমরা ঠেকিয়ে দিতে পারবো না। একটি শহরকে বদলে দেয়ার বা একটি দেশকে বদলে দেয়ার জন্য মানুষের ভালোবাসা, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং একই সাথে সরকারের পদক্ষেপই প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কা সেটি করে দেখিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই বন্ধু দেশটি, যা একসময় বাংলাদেশের নেতৃত্ব মেনেছিল এবং বিপ্লবের পর বাংলাদেশ থেকে ঋণ নিয়ে তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়েছিল, এখন এমনভাবে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করে কলম্বো শহরকে সুরক্ষিত রাখতে শ্রীলঙ্কার এই প্রচেষ্টা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
এই ভিডিওতে দেখানো হয়েছে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো শহর ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে এই শহরের অর্ধেক অংশ ডুবে যেতে পারে। এই সতর্ক বার্তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply