গাজায় যুদ্ধবিরতির খবর বিশ্বজুড়ে স্বস্তি এনেছিল, কিন্তু এই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যেখানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মুসলমান প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন, সেখানে এখন নতুন এক ভয়াবহ বাস্তবতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে – গাজায় দুর্ভিক্ষ। যুদ্ধ থামলেও ধ্বংসস্তূপ আর মানবিক বিপর্যয় তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
যুদ্ধবিরতির পরের বাস্তবতা
অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি মুসলমান নিজেদের বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করলেও, তাদের সেই বসতি এখন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। দালান, ইট, সুরকি ছাড়া বাড়িঘর বলতে তাদের আর কিছু নেই। রাস্তাঘাট ভাঙা, পানি সরবরাহ বন্ধ, বিদ্যুৎ নেই, ড্রেনেজ সিস্টেম অচল। দোকান, বাজার, হাসপাতাল, স্কুল – সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সর্বস্বান্ত মানুষগুলো কিভাবে বেঁচে আছেন, খাচ্ছেন কি, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পুনর্বাসন কার্যক্রম ও চ্যালেঞ্জ
মিশরের কায়রোতে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হুজাইফা খান, যিনি ‘ওয়ার্ল্ড ওয়ান উম্মাহ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের মানবিক সহায়তা দিচ্ছেন, তিনি জানান যে যুদ্ধের চেয়েও এখন ভয়াল পরিস্থিতি। তাদের পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে, যেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অনুদান আসছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনিদের মাথা গোঁজার জন্য অস্থায়ী তাবু, স্যানিটারি ব্যবস্থা, সুপেয় পানি এবং খাদ্য ও আবাসনের ব্যবস্থা করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তবে মিশরের সাথে গাজার রাফা ক্রসিং দিয়ে কেবল ত্রাণবাহী গাড়ি চলাচলের অনুমতি থাকলেও, সরাসরি গাজায় গিয়ে সহায়তা কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ওয়ার্ল্ড ওয়ান উম্মাহ ফাউন্ডেশন মিশর থেকেই ফিলিস্তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে গাজার ভেতরে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। নগদ টাকা, তাবু, খাবার, কম্বল, ওষুধ তালিকা করে বিতরণ করা হচ্ছে। সরাসরি গাজার কোনো বাসিন্দাকে পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকে টাকা বা সহায়তা পাঠানো এখন সম্ভব নয়, স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমেই পাঠাতে হবে।
বাংলাদেশের ভূমিকা ও মানবিক সহায়তা
হুজাইফা খানের সংগঠন মিশরে আশ্রয় নেওয়া ১০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে সহায়তা দিয়েছে। যুদ্ধাহত ও পঙ্গু অনেকেই এর অন্তর্ভুক্ত। ফিলিস্তিনি মুসলমানরা বাংলাদেশের মানুষকে পরম বন্ধু বা আত্মীয়ের মতো দেখে। লাল-সবুজ পতাকা বা কোনো চিহ্ন দেখলেই তারা ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান দেয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও ভয়াল শীতে গাজা
বর্তমানে গাজায় অনাহারী ও অসুস্থ মানুষের সংখ্যা এতটাই বেশি যে সহায়তা দিয়ে কুলানো যাচ্ছে না। উত্তর গাজা ও খান ইউনিসে প্রতিদিন অন্তত ২০০০ ট্রাক সহায়তা দরকার হলেও, সেখানে মাত্র ৩০০-৪০০ ট্রাক ঢুকতে পারছে। পুষ্টিকর খাবার যেমন বীজ, জলপাই পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অন্যদিকে বিস্কুট, চকলেট, কোমল পানীয় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। তাই খাবার, পানি, ঔষধ ও জরুরি পণ্য নিয়ে চলছে হাহাকার, যা গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
যুদ্ধবিরতি হলেও চোরাগুপ্তা হামলা এখনো চলছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে যে পুষ্টির অভাবে গাজার হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এখন মৃত্যুঝুঁকিতে। শীত পড়তে শুরু করেছে এবং গাজায় তাপমাত্রা মাইনাসেও নামে। ঘর, গরম কাপড়, খাবারবিহীন এই শীতে মজলুম মানুষগুলোর দিন কেমন কাটবে, তা যুদ্ধের চেয়েও ভয়াল এক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।
এই ভিডিওতে আমরা দেখেছি কিভাবে বাংলাদেশি তরুণ হুজাইফা খান এবং তার সংগঠন World One Ummah Foundation গাজায় পুনর্বাসন কার্যক্রম চালাচ্ছেন, মিশর সীমান্ত থেকে মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছেন, আর কিভাবে বাংলাদেশ এখন ফিলিস্তিনী মানুষের কাছে আশা ও বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভিডিওটি দেখুন, আর জানুন কিভাবে শান্তির পরেও গাজায় বেঁচে থাকার যুদ্ধ এখনো চলছে।
যোগাযোগের জন্য: [email protected]

Leave a Reply