২০২৬ সালকে সুদানের জন্য ‘শান্তির বছর’ ঘোষণা করা হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। একসময়ের ব্যস্ত খার্তুম এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। জাতিসংঘের মতে, সুদান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের শিকার, যেখানে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম এই দেশটি কেন এমন ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে পুড়ছে? এই সুদানের গৃহযুদ্ধের পেছনে আসল মাস্টারমাইন্ড কারা? কেন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এই সংঘাতকে আরও উসকে দিচ্ছে?
দুই জেনারেলের ক্ষমতার দ্বন্দ
২০১৯ সালে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ওমর আল-বশীরের পতনের পর সুদানের ক্ষমতা দখল করেন দুই জেনারেল: সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং কুখ্যাত প্যারামিলিটারি ফোর্স আরএসএফ (Rapid Support Forces) এর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ হামদান তাগালু (হেমেদতি)। শুরুতে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলেও, সামরিক বাহিনীর একীভূতকরণ নিয়ে তাদের মধ্যে ফাটল ধরে। বুরহান চেয়েছিলেন দ্রুত আরএসএফকে মূল সেনাবাহিনীর অধীনে আনতে, যা হেমেদতির ক্ষমতাকে খর্ব করতো। হেমেদতি, যিনি সামরিক একাডেমি থেকে পাশ করা নন এবং দারফুরের জাঞ্জাভিদ মিলিশিয়া নেতা হিসেবে পরিচিত, নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে বাহিনী একীভূতকরণে ১০ বছর সময় চেয়েছিলেন। এটি কেবল ইগোর লড়াই ছিল না, ছিল সুদানের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের লড়াইও।
অর্থনৈতিক স্বার্থ ও যুদ্ধের রসদ
এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ। জেনারেল হেমেদতি সুদানের অধিকাংশ সোনার খনি এবং স্বর্ণ বাণিজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই সোনা দুবাই বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করে বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। এই অর্থ দিয়েই আরএসএফকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, বুরহান এবং সেনাবাহিনী সুদানের বড় বড় কৃষি প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও পানীয় শিল্পের এক অপরিহার্য উপাদান গাম এরাবিক-ও এই যুদ্ধের অন্যতম রসদ। বিশ্বের মোট গাম এরাবিকের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আসে সুদান থেকে। আরএসএফ এখন গাম এরাবিক উৎপাদনের রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এই বাণিজ্য থেকে মোটা অংকের অর্থ উপার্জন করছে। এই কনফ্লিক্ট গাম প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার হয়ে রিব্রান্ডিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে, যা অজান্তেই সুদানের গৃহযুদ্ধের আগুনে ঘি ঢালছে।
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ এবং ছায়া যুদ্ধ
সুদান এখন কেবল একটি গৃহযুদ্ধের ক্ষেত্র নয়, এটি পরিণত হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক প্রক্সি ওয়ার বা ছায়া যুদ্ধের রঙ্গমঞ্চে। লোহিত সাগরের কৌশলগত অবস্থান, নীলনদের প্রবাহ এবং মাটির নিচে সোনার খনি সুদানকে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কামড়ামড়ির কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
- সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই): আরএসএফ-এর মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অভিযোগ করা হয়। মানবিক সাহায্যের আড়ালে চাঁদের আমচারাস বিমানবন্দর দিয়ে অস্ত্র পাচারের অভিযোগ রয়েছে, যার বিনিময়ে আরএসএফ-এর নিয়ন্ত্রিত খনি থেকে সোনা দুবাই পাচার হয়।
- ইরান: সেনাবাহিনীর নাজুক অবস্থায় ইরান তাদের তৈরি মহাজের সিক্স ড্রোন দিয়ে বুরহানকে সহায়তা করেছে, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
- মিশর: নীলনদের প্রবাহ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরাসরি সুদানের সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়েছে এবং লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছে।
- রাশিয়া: প্রাথমিকভাবে ওয়াগনার গ্রুপ (বর্তমানে আফ্রিকা কর্পস) আরএসএফ-কে সোনার খনি নিরাপত্তায় এবং জ্বালানি-অস্ত্র সরবরাহে সহায়তা করলেও, সম্প্রতি লোহিত সাগরে নৌঘাটি করার লোভে সেনাবাহিনীর সাথেও সম্পর্ক উন্নয়ন করছে।
- আমেরিকা ও ইউরোপ: মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও, আরএসএফ-এর অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখছে। তাদের ভূমিকা এখানে অনেকটা “বাজ বিচার করে ক্ষোভ দেখানো”-এর মতো।
মানবিক বিপর্যয় এবং জাতিগত নিধন
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ আজ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আরএসএফ এবং সেনাবাহিনী উভয়পক্ষই ত্রাণ সহায়তাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে পশ্চিমের দারফোর অঞ্চলে যুদ্ধটি এক ভয়াবহ জাতিগত নিধনে রূপ নিয়েছে। আরএসএফ যোদ্ধারা, যারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত, অনারব বা আফ্রিকান আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে মাসালিদ সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই ঘটনাকে সরাসরি গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে। নারীদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সুদানের ভবিষ্যৎ: বিভাজন নাকি নৈরাজ্য
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মহল থেকে যে যুদ্ধবিরতির চাপ দেওয়া হচ্ছে, তা সুদানকে ভেঙে ফেলার একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পের অংশ হতে পারে। যখনই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সেনাবাহিনী এবং আরএসএফকে একই টেবিলে বসানো হয়, তখনই পরোক্ষভাবে আরএসএফকে একটি বিদ্রোহী মিলিশিয়া থেকে সমান্তরাল সরকারের মর্যাদা দেওয়া হয়, যা সুদানকে লিবিয়া মডেলের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে একটি দেশ দুটি সেনাবাহিনী, দুটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং দুটি পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কার্যকরভাবে বিভাজিত হয়ে যাবে।
যদি আরএসএফের হাতে ক্ষমতা বা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ থাকে, তবে সুদান সোমালিয়ার মতো নৈরাজ্যের শিকার হতে পারে, যেখানে আইন বলে কিছু থাকবে না, কেবল ওয়ার্ল্ড লর্ডদের দাপট থাকবে।
সুদান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই জেনারেলের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে দেশটি, যার পেছনে রয়েছে গাম এরাবিক ও সোনার মতো অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির ইন্ধন। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে দেশটি কি লিবিয়ার মতো বিভক্ত হবে নাকি সোমালিয়ার মতো নৈরাজ্যে ডুবে যাবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন:

Leave a Reply