দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশীদের সাফল্যের গল্প ক্রমশ অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। সাধারণ কর্মী থেকে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে, অনেকে এখন মিলিওনিয়ার। আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশী প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং উদ্ভাবনী মনোভাব নিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়ে তুলছেন। এই দেশটি কিভাবে তাদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, চলুন জেনে নিই সেই অজানা কাহিনী।
কিভাবে বাংলাদেশীরা আর্জেন্টিনায় এলেন?
আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশীদের আগমন শুরু হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার বা আমিরাতে বসবাসকারী কিছু বাংলাদেশী উন্নত জীবন এবং পাসপোর্টের সন্ধানে আর্জেন্টিনায় আসতে শুরু করেন। সেই সময় টুরিস্ট ভিসা বা অন অ্যারাইভাল ভিসা সহজ ছিল। ইউরোপের ইতালি, স্পেন, পর্তুগালে যারা কাগজপত্র করতে পারেননি, তাদের অনেকে আর্জেন্টিনায় চলে আসেন।
অনেকেই সরাসরি আর্জেন্টিনায় আসেননি, বরং ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে হয়ে সীমান্ত পথে এদেশে প্রবেশ করেছেন। যদিও এখন সীমান্ত পার হওয়া সহজ নয়, তবু কষ্ট করে আসা সেই সময়ের বাংলাদেশীদের প্রায় সবাই আজ সফল।
কেন আর্জেন্টিনা বেছে নিলেন?
- সহজ নাগরিকত্ব: ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় আর্জেন্টিনায় নাগরিকত্ব পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। বৈধভাবে পৌঁছালে দুই মাসের টেম্পোরারি রেসিডেন্সি এবং ছয় মাসে পারমানেন্ট রেসিডেন্সি পাওয়া যায়। দুই বছর বসবাস, স্থায়ী ঠিকানা, চাকরি বা ব্যবসার প্রমাণ এবং কোনো অপরাধের রেকর্ড না থাকলে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা যায়। এক থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।
- আবহাওয়া ও পরিবেশ: বাংলাদেশের পরিবেশ ও আবহাওয়ার সাথে বুয়েনোস আইরেসের মিল থাকায় তারা বেশ মানিয়ে নিতে পেরেছেন। দেশটিতে প্রচুর সবুজিমা এবং পার্ক রয়েছে, যা পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য আদর্শ।
- বৈষম্যহীন সমাজ: আর্জেন্টিনায় কালো, সাদা, ছোট, বড়, ধনী, গরীব নির্বিশেষে সবাই সবাইকে সম্মান করে। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য দেখা যায় না, যা প্রবাসীদের জন্য ইতিবাচক।
- অর্থনৈতিক সুযোগ: ব্যবসার পরিবেশ অনেক ভালো। দুর্নীতি কম এবং সবকিছু আইন মোতাবেক চলে। এখানে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করাও নিরাপদ বলে মনে করেন প্রবাসীরা।
ব্যবসার ক্ষেত্র এবং পুঁজি
আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশীরা মূলত মোবাইল এক্সেসরিজ, ইলেকট্রনিক্স এবং গার্মেন্টস পণ্যের পাইকারি ব্যবসায় জড়িত। এই ক্ষেত্রগুলোতে চাইনিজদের পরে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন বাংলাদেশীরা। এছাড়াও অনেকে গ্রোসারি শপ চালাচ্ছেন। শুরুতে তাদের পুঁজি ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার। সেই সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসা আজ অনেককে মিলিওনিয়ারে পরিণত করেছে।
একজন সফল আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশী ব্যবসায়ী জানান, তার অধীনে বর্তমানে ৮ জন কর্মচারী কাজ করেন, যাদের মধ্যে বলিভিয়া, পেরু, প্যারাগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার স্থানীয় নাগরিকরা রয়েছেন। এটি তাদের জন্য একটি গর্বের বিষয়।
সামাজিক জীবন ও পরিবার
অনেক আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশী এখন দেশটির পাসপোর্টধারী। তারা নিজেদের স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মা, ভাইদেরও এই শহরে নিয়ে এসেছেন। পরিবারের সাথে তারা এখানকার পার্কগুলোতে ঘর থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে উইকেন্ডে সময় কাটান। এখানকার চমৎকার সামাজিক জীবন এবং রিলাক্স করার সুযোগ তাদের খুব ভালো লাগে।
চ্যালেঞ্জ এবং পরামর্শ
একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রায় ১৯ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ হওয়ায় চাইলেই যখন তখন বাংলাদেশে যাওয়া কঠিন। বিমান ভাড়াও অনেক বেশি, প্রায় ৩ থেকে ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত লাগে। দীর্ঘ যাত্রার ধকল তো আছেই।
যারা আর্জেন্টিনায় আসতে আগ্রহী, তাদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ রয়েছে:
- দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করা একেবারেই উচিত নয়। বর্তমানে আর্জেন্টিনায় অবৈধভাবে ঢুকে কাগজপত্র করা অত্যন্ত কঠিন।
- স্প্যানিশ ভাষা শেখা আবশ্যক। ভাষা না জানলে চাকরি, ব্যবসা বা কাগজপত্র সংক্রান্ত কোনো কাজই সহজে করা যাবে না।
- ঢাকায় এখন আর্জেন্টিনার দূতাবাস রয়েছে। তাদের মাধ্যমে বৈধভাবে ভিসা নিয়ে আসা উচিত।
- মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের দেশগুলোতে যারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না, তারা বৈধ পথে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আর্জেন্টিনায় বিনিয়োগ ও ব্যবসার চমৎকার সুযোগ রয়েছে।
আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশী প্রবাসীরা কিভাবে সাধারণ কর্মী থেকে সফল ব্যবসায়ী ও মিলিওনিয়ার হয়ে উঠছেন, সেই অনুপ্রেরণামূলক গল্প এই ভিডিওতে দেখুন। জানুন তাদের জীবন সংগ্রাম, ব্যবসার কৌশল এবং নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়া।

Leave a Reply