সৌদি আরবে বাংলাদেশি আরিফ খান মুন্না একজন অসাধারণ মাইনিং এক্সপার্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাবনা থেকে সাধারণ লেবার ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন ২৪ বছর আগে। তার অদম্য পরিশ্রম এবং মেধার জোরে তিনি আজ সৌদির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আল আইয়ুনি কোম্পানির সুপারভাইজার। কীভাবে একজন সাধারণ লেবার সৌদি আরবের বিশাল পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন, সেই গল্পই আমরা আজ জানবো।

সৌদি আরবের কঠিন ভূখণ্ডে আরিফের যাত্রা

সৌদি আরবের ভূখণ্ড বেশিরভাগই পাহাড়, মরুভূমি এবং সাগরবেষ্টিত। এখানে সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে তাবুক, হিজাজ, আসির, আবহা এবং জিজানের মতো অঞ্চলগুলো লোহার মতো কালো পাথর বা আগ্নেয় শিলায় ভরপুর। আরিফ খান মুন্না ২০০২ সালে লেবার হিসেবে সৌদি আরব যান, যখন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প কেবল শুরু হচ্ছিল। প্রথম দিকে তিনি বিভিন্ন প্রজেক্টে সাধারণ শ্রমিকের কাজ করতেন, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক কঠিন ছিল।

লেবার থেকে মাইনিং এক্সপার্ট হওয়ার গল্প

২০০৩ সাল থেকে আরিফ মাইনিং এর কাজ শুরু করেন। তার প্রথম শিক্ষক ছিলেন কোম্পানির মালিকের ছেলে সোলায়মান আয়ুনি, যিনি ছিলেন লাইসেন্সধারী বিস্ফোরক। সোলায়মানের কাছেই আরিফ ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ভাঙার কৌশল রপ্ত করেন। ধীরে ধীরে তিনি সহকারী ফোরম্যান, স্পেশালিস্ট এবং অবশেষে সুপারভাইজার পদে উন্নীত হন। তার কাজ এতটাই নিখুঁত যে, তিনি শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু ভাঙেন, বাকি এলাকা সুরক্ষিত থাকে।

মেগা প্রকল্পে আরিফ খান মুন্নার অবদান

আরিফ খান মুন্না সৌদি আরবের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নিওম (NEOM) প্রকল্পের অংশ হিসেবে দ্য লাইন (The Line) এবং টরজেনা (Trojena) এর মতো মেগা প্রকল্পে কাজ করেছেন। ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পে পাহাড়ের উপর পর্যটন শহর এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, যেখানে আউটডোর স্কি, তারকা হোটেল এবং কেবল কারের মতো সুবিধা থাকবে। রিয়াদ থেকে কাসিম পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার রেল প্রজেক্টেও তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

আরিফের নেতৃত্ব এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ

বর্তমানে আরিফের টিমে প্রায় ৭১ জন সদস্য আছেন, যাদের মধ্যে সৌদি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, নেপালি এবং বাংলাদেশি নাগরিকরা রয়েছেন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এই বিশাল দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রায় ২২-২৩ বছর ধরে তিনি এই ঝুঁকিপূর্ণ মাইনিং কাজে জড়িত আছেন, কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনো ভুল বা দুর্ঘটনা ছাড়াই তিনি সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার কাজ এমন যে, একটি ১২০ কিলোমিটারের সোজা রাস্তা তৈরি করতে পাহাড় পড়লে, ড্রিলিং টিম গর্ত করার পর আরিফের টিম সুপরিকল্পিতভাবে বোমা ফেলে পাহাড় সরিয়ে দেয়, যাতে কারো ক্ষতি না হয়। স্থানীয় পুলিশও তাদের কাজে সহায়তা করে।

পরিশ্রম ও সাফল্যের উদাহরণ

আরিফ খান মুন্নার গল্পটি প্রমাণ করে যে পরিশ্রম, একাগ্রতা এবং নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো মানুষই সফল হতে পারে। তার এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য গর্বের এবং প্রবাসে বসবাসকারী অন্যান্য বাংলাদেশিদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। কোনো কাজই ছোট নয়, সঠিক মনোযোগ দিয়ে কাজ করলে সম্মান এবং অর্থ দুটোই অর্জন করা সম্ভব।

এটি পাবনার যুবক আরিফ খান মুন্নার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প, যিনি সাধারণ লেবার হিসেবে সৌদি আরবে গিয়ে মাইনিং এক্সপার্ট হয়েছেন। তিনি সৌদি আরবের বিশাল পাহাড় কেটে মেগা প্রকল্পের জন্য রাস্তা তৈরি করছেন, যার মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নিওম প্রকল্পও রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, পরিশ্রম ও একাগ্রতা থাকলে যেকোনো মানুষ লেবার থেকে লিডার হতে পারে।