সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ী প্রদেশ তাবুকে অবস্থিত ওয়াদি আল দিশা (Wadi Al Disah) নামের এক অসাধারণ উপত্যকা। এই জায়গাটি এতটাই অদ্ভুত ও মনোরম যে, অনেকে একে “বেহেশতের দরজা” বলে থাকেন। কোরআনে বর্ণিত স্বর্গের বর্ণনার সাথে এর অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা মানুষকে বিস্মিত করে। একই সাথে, স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী এটি জিনের বসতি হিসেবেও পরিচিত। এই প্রবন্ধে আমরা ওয়াদি আল দিশার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, এর রহস্য এবং এই স্থান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত জানবো।

ওয়াদি আল দিশা: এক লুকানো প্রাকৃতিক বিস্ময়

তাবুক শহর থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওয়াদি আল দিশা একটি বিশাল মরু উদ্যান এবং উপত্যকা, যা প্রায় ৭০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে পৌঁছালে মনে হবে আপনি যেন দুনিয়া ছেড়ে অন্য কোথাও চলে এসেছেন। এর পথ, মাটি, গাছপালা, এবং পাহাড় সবকিছুই আলাদা ও মনোমুগ্ধকর। বিস্তীর্ণ এই এলাকায় বইছে এক অপার্থিব প্রশান্তিময় বাতাস, যা মন জুড়িয়ে দেয়।

এই লুকানো গিরিখাতের দুই পাশে সারি সারি নানা আকারের অদ্ভুত সব পাহাড়। এর রংও ভিন্ন ভিন্ন—কোথাও সাদা, কোথাও নীল, কোথাও লাল, কোথাও সবুজ, আবার কোথাও কালো। একই পাহাড়ের মধ্যে রঙের এমন বৈচিত্র্য দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি এখানে নিজেই রং ছড়িয়ে শিল্পকর্ম তৈরি করেছে। এখানকার গাছপালাও সাধারণ নয়, স্বর্ণালী সবুজ পাতার কান্ড ও গোড়া দেখতে খুবই সুন্দর। পাহাড়ি ঝর্ণার স্বচ্ছ জলে বয়ে গেছে ছোট্ট খাল, যার দুই ধারে গজিয়েছে সবুজ বাগান। এই বহমান পানি বেশ মিষ্টি স্বাদের এবং অনেকে এটিকে সর্বরোগের জন্য উপকারী বলেও মনে করেন।

কোরআনের বর্ণনার সাথে ওয়াদি আল দিশার মিল

ওয়াদি আল দিশার মনোরম প্রকৃতি এবং এর অদ্ভুত সৌন্দর্য দেখে স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষেরা একে “বেহেশতের দরজা” বা “বেহেশতী দুয়ার” বলে থাকেন। কোরআনে জান্নাতের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার অনেক অংশের সাথে এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে এখানকার উর্বর জমি, বিভিন্ন ধরনের ফল ও ঘাস, এবং সতেজ পরিবেশে হৃষ্টপুষ্ট প্রাণীকুল এই ধারণা আরও বদ্ধমূল করে। এখানকার ভিন্ন ভিন্ন রঙের পাহাড়, মসৃণ শিলা, এবং অপূর্ব শান্ত পরিবেশ সত্যিই এক অলৌকিক অনুভূতি দেয়, যা কোরআনের বর্ণনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

জিনের বসতি নাকি প্রকৃতির রহস্য?

ওয়াদি আল দিশা ঘিরে মানুষের কৌতূহল এবং নানা রকমের মিথ কথা-উপকথা প্রচলিত আছে। স্থানীয়দের কাছে এই এলাকাটি জিনের বসতি বলেও পরিচিত। রাতে এখানে তেমন একটা কেউ চলাচল করেন না। এমনকি, এখানে একটি পাহাড়ের গুহায় “গর্ভবতী নারীর পাথর মূর্তি” আছে বলে শোনা যায়। কথিত আছে, এই মূর্তি দেখলে দর্শনার্থীদের ক্ষতি হয়, তাই পর্যটকরা সেই দিকে খুব একটা যাওয়ার সাহস করেন না। এই লোককথাগুলো ওয়াদি আল দিশার রহস্যময়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যা প্রাকৃতিক বিস্ময়ের পাশাপাশি এক অন্যরকম রোমাঞ্চ তৈরি করে।

ওয়াদি আল দিশা ভ্রমণ: কিছু জরুরি তথ্য

ওয়াদি আল দিশা একটি দুর্গম এলাকা, চাইলেই খুব সহজে সেখানে পৌঁছানো যায় না। তাবুক শহর থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই উপত্যকায় যেতে হলে ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি আবশ্যক, কারণ এখানে কোনো পাকা সড়ক নেই, সবই ভাঙাচোরা এবং বালুময় মরুপথ। ছোটখাট গাড়ি নিয়ে গেলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই এলাকায় খাবার-দাবারের জন্য কোনো হোটেল নেই। তবে পাহাড়ের উপর কয়েকটি ফার্ম হাউস বা মাজরা আছে সৌদিদের। আগে থেকে যোগাযোগ করে গেলে সেখানে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত পাওয়া যায়, যদিও এর জন্য মোটা অংকের টাকা খরচ করতে হতে পারে। যারা ছোট গাড়ি নিয়ে যাবেন, তারা গাড়ি নিরাপদে রেখে স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের কাছ থেকে জিপ ভাড়া নিয়ে উপত্যকার বিভিন্ন পথে ঘুরতে পারবেন। শীতকালে এখানে তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, যা ভ্রমণের জন্য বেশ আরামদায়ক। অনেক সৌদি পরিবার ছুটি বা অবসরে এখানে পরিবার নিয়ে ক্যাম্পিং করতে আসে।

ওয়াদি আল দিশার মাইলের পর মাইল বিস্তৃত প্রাকৃতিক পাহাড়, সবুজ লাল হলুদ কালো রঙের বিন্যাস এবং এখানকার প্রতিটি অংশের ভিন্নতা আপনাকে মুগ্ধ করবে। এটি সত্যিই সৃষ্টিকর্তার এক অপরূপ সৃষ্টি, যা দেখার সুযোগ পেলে আপনার মন ভরে উঠবে এক অনির্বচনীয় শান্তিতে।

ওয়াদি আল দিশা, সৌদি আরবের একটি আশ্চর্য উপত্যকা যা মরুভূমির চিরাচরিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। এখানে পাহাড়, ঝর্ণা, সবুজ বাগান আর প্রশান্ত বাতাস একসাথে মিলে এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করেছে। অনেকে একে “বেহেশতের দরজা” বললেও, স্থানীয়দের কাছে এটি জিনের বসতি হিসেবেও পরিচিত। এই ভিডিওতে ওয়াদি আল দিশার প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং সেখানে ভ্রমণের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি জায়গা নয়, এটি একটি বিশেষ অনুভূতি।

যোগাযোগ: [email protected]