বিশ্বকাপজয়ী লিওনেল মেসি, বিশ্বজুড়ে যার কোটি কোটি ভক্ত, কিন্তু মেসির গ্রামের জীবন আজও খুব সাধারণ। রোজারিও শহরের এই গ্রামেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং ফুটবলের সাথে প্রথম পরিচয়। এত বড় একজন তারকা হওয়ার পরও, সুযোগ পেলেই মেসি তার শৈশবের এই জায়গায় ফিরে আসেন, বন্ধুবান্ধবদের সাথে সময় কাটান। আজ আমরা দেখব মেসির বাড়ি, তার পুরোনো ক্লাব এবং স্কুল – সবকিছুই মেসির সাফল্যের পরেও যেন আগের মতোই রয়ে গেছে।
রোজারিও, মেসির জন্মভূমি
আর্জেন্টিনার রোজারিও আহামরি কোনো ব্যস্ত শহর নয়, বরং আমাদের উপজেলাগুলোর মতোই শান্ত ও ফাঁকা। কিন্তু এই শহরেই জন্মেছেন, ফুটবল শিখেছেন এবং বড় হয়েছেন লিওনেল মেসি। সাড়ে তিনশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা মেসির বাড়িতে এসেছিলাম। যদিও মেসির পুরনো সেই বাড়িতে এখন রং বদলেছে এবং কিছুটা আধুনিকায়ন করা হয়েছে, তবুও ভক্তদের ভালোবাসার বন্ধন আজও অটুট। এটি একটি দেড়তলা বাংলো টাইপের বাড়ি, যেখানে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে যেমন, আগে এমন গেট ছিল না, এখন সিকিউরিটি গেট বসানো হয়েছে। কারণ মেসি যখন আসতেন, তখন ভক্তদের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়তো। বাড়ির সামনের গ্রিলে আর্জেন্টিনার পতাকা, বিভিন্ন জনের সিগনেচার আর ভালোবাসার চিহ্ন লাগানো আছে, যা মেসির প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে।
মেসির একজন বাল্যবন্ধু ও প্রতিবেশী সিলভিনা, যিনি ইসতাদু ইসরাইল নামক একটি রাস্তার উল্টো দিকে থাকেন। মেসি যখন গ্রামে আসেন, তখন সিলভিনার সাথে তার দেখা হয়, তারা হাসিতামাশা করেন এবং ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করেন। মেসি সিলভিনাকে তার অটোগ্রাফযুক্ত একটি জার্সিও উপহার দিয়েছেন। সিলভিনা বাংলাদেশি ব্যবসায়ী হাসান ইমাম খানের (আনিস ভাই) কাছে বাংলাদেশিদের সাথে ব্যবসা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং মেসির নানার জন্য একটি দোকান খোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
মেসির শৈশব ও সংগ্রামী জীবন
১৯৮৭ সালের ২৪শে জুন সান্তা ফে প্রদেশের এই মহল্লাতেই মেসির জন্ম। তার বাবা জর্জ মেসি ও মা সেলিয়া মারিয়া দুজনেই ছিলেন কারখানার শ্রমিক। দরিদ্র পরিবারে মেসি এই বাড়িতেই বেড়ে ওঠেন। পরিবারের কাছে তার ডাক নাম ছিল লিও। চাচাতো ভাই ম্যাক্সি মিলিয়ানো ও ইমানুয়েল ছিলেন ছোটবেলায় তার খেলার সাথী। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি স্থানীয় ক্লাব গ্যান্ডলিতে যোগ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দশ বছর বয়সে হরমোনের অভাবে তার শরীর মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রতি কয়েকদিন পর পর একটি বিশেষ ইনজেকশন না নিলে মেসি যেন দাঁড়াতেই পারতেন না। চিকিৎসার খরচ জোগাতে তার পরিবারকে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়েছিল। এত কষ্ট ও সংকটের মধ্যেও মেসি থেমে যাননি।
এখনও সাধারণ, এখনো প্রিয় লিও
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবলার হওয়ার পরও, গ্রামে এলে মেসি শৈশবের সেসব দিনের কথা মনে করেন, তার বন্ধুদের এবং প্রিয় ক্লাবকেও ভোলেননি। মহল্লার জেনারেল লাস হেরাস স্কুলে পড়তেন মেসি, যা এখন তাকে দারুণ সম্মান করে। স্কুলের দেয়ালে মেসির প্রতিকৃতি এবং গেটে স্মারক পোস্ট লাগানো হয়েছে। শুধু স্কুল নয়, পুরো এলাকায় স্থানীয় পৌরসভা “মেসি সার্কিট” তৈরি করেছে, যাতে ভক্তরা মেসির বাড়ি, স্কুল ও খেলার মাঠ সবই একসাথে দেখতে পারেন। ১৩ বছর বয়সে পরিবারকে নিয়ে মেসিকে স্পেনের বার্সেলোনা চলে যেতে হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। সেখানকার যুব একাডেমী লা মাসিয়াতে তিনি তার ফুটবল জীবন শুরু করেন।
এই আর্জেন্টাইন ফুটবলার বছরে ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মিনিটে তার আয় প্রায় ৩ লাখ টাকারও বেশি। এত বিশাল অর্থ উপার্জন সত্ত্বেও, এই বিশ্বনায়কের জীবনযাপন ও আচরণ আজও অত্যন্ত সাধারণ। গরমের ছুটিতে রোজারিওর গ্রামে এলে মেসি আজও আগের মতোই ঘুরে বেড়ান, আর তাই এলাকার সবাই তাকে খুব ভালোবাসেন। রোজারিওতে তার পরিচিতি “দ্যা সান অফ সিটি” অর্থাৎ “শহরের সন্তান” নামে। নিজের বাড়িটিকে আরও সুন্দর ও সুরক্ষিত করেছেন মেসি, আর বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আজও তিনি ভক্তদের ভালোবাসার জবাব দেন।
বিশ্বকাপজয়ী লিওনেল মেসির গ্রামের জীবন কেমন, রোজারিও গ্রামে তার আসল জীবন সম্পর্কে জানুন। মেসির শৈশবের বাড়ি, যেখানে তিনি আজও সাধারণ একজন মানুষ। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় নাম হওয়া সত্ত্বেও, নিজের গ্রামে মেসি আজও শুধু “লিও” নামেই পরিচিত। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে মেসির শৈশবের বাড়ি, স্কুল, ক্লাব এবং তার বাল্যবন্ধুদের নিয়ে এই ভিডিওতে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এখানে আপনি মেসির জন্মস্থান, তার প্রতিবেশী ও বন্ধুদের স্মৃতি এবং একজন তারকা হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে মেসির জীবন দেখতে পাবেন। বাংলাদেশে যাকে কোটি ভক্ত ভালোবাসে, তার শিকড় আজও মাটির সঙ্গেই যুক্ত।

Leave a Reply