তাবুক, সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমের একটি ছোট্ট শহর, যা জর্ডান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। পাহাড় আর মরুভূমির এই অঞ্চলে এক লাখের বেশি বাংলাদেশী বসবাস করেন। এই শহরে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা বাংলা ভাষাভাষী মানুষ দেখলে মনে হয় যেন নিজের দেশেরই কোনো এক জেলা শহরে আছেন। এখানে বাংলাদেশীদের জয় জয়কার, অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের তুলনায় তারা বেশ সুখে দিনাতিপাত করছেন। কিন্তু তাবুকে বাংলাদেশী প্রবাসীরা কেন এত সুখী?

তাবুকের কৃষিতে বাংলাদেশীদের বিপ্লব

বহুকাল আগে বাংলাদেশীরা তাবুকে আসা শুরু করেন মূলত কৃষিকর্মী হিসেবে। শুরুর দিকে এই অঞ্চলের বহু জমি অনাবাদী ছিল, যেখানে আফগান ও পাকিস্তানি দীর্ঘদেহী পাঠানরাও কঠোর পরিশ্রম করেও ফসল ফলাতে পারতেন না। সৌদি জমি মালিকরা তখন বিভিন্ন শহর থেকে বাংলাদেশীদের এনে চাষাবাদের ধরন বদলান। বর্তমানে তাবুকের কৃষি খামার বা কারবারের পুরোটাই বাংলাদেশীদের নিয়ন্ত্রণে। বহু খামারের মালিক বাংলাদেশী। তারা সারাবছর ধরে নানা ফল, ফসল ও সবজির চাষ করে এই অনুর্বর এলাকাকে রীতিমতো শস্য-শ্যামলা করে তুলেছেন।

মতি ভাই, যিনি একসময় রেস্তোরাঁর হেল্পার ছিলেন, এখন তাবুক শহরের একজন বড় ব্যবসায়ী। তার হাতের তৈরি মেহন্দি (এক ধরনের বিরিয়ানি) খুবই সুস্বাদু। আহমেদ হোসেন রিপন, যিনি ৮০-এর দশকে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে তাবুকে এসেছিলেন, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য বদলেছেন এবং এখন তার বড় ব্যবসা রয়েছে। এমন হাজার হাজার বাংলাদেশী তাবুকে নিজেদের পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

ব্যবসায়িক কেন্দ্রে বাংলাদেশীদের জয়জয়কার

তাবুক শহরের মূল বাণিজ্যিক এলাকা, যা ‘শের আলম’ নামে পরিচিত, এখন অনেকটাই বাংলাদেশীদের দখলে। এখানে কয়েকশ দোকান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশির মালিক প্রবাসী বাংলাদেশী। এই এলাকায় বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড দেখা যায়, এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা আড্ডা দেয় ও গল্প করে। দোকানে দোকানে বাংলাদেশি শাক-সবজি, চাল, ডাল, এমনকি প্রাণ, স্কয়ার, বিডি ফুডসের হলুদ, মরিচের গুঁড়া, ও চানাচুরও পাওয়া যায়। এখানে কয়েকটি রেস্টুরেন্টও আছে, যেখানে জিলাপি, সিঙ্গারা, মিষ্টিসহ দেশি খাবার দেদারসে বিক্রি হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এই এলাকা যেন বাংলাদেশীদের মেলায় পরিণত হয়, যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকে না। সুপারমার্কেট, খাবার হোটেল, ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক, স্যানিটারি, ও মোবাইল ফোনের ব্যবসা সহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশীরা সফলভাবে জড়িত আছেন।

পেশাজীবীদের জন্য শান্তির আশ্রয়স্থল

শুধু ব্যবসায়ী বা কৃষক নয়, তাবুকে বাংলাদেশী পেশাজীবীরাও বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। এখানকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশী অধ্যাপক, ডাক্তার, ও ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন। এমনকি আমেরিকা ও কানাডার মতো উন্নত দেশের জীবন ছেড়ে অনেকেই আরবের এই শহরে এসে থিতু হয়েছেন, কারণ তারা এখানে একটি শান্তিপূর্ণ ও আরামদায়ক জীবন খুঁজে পেয়েছেন। তারা পরিবার নিয়ে এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছেন এবং এখানকার সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করছেন।

সুযোগ ও সম্মান

সৌদি আরবের অন্যান্য অঞ্চলের বাংলাদেশীদের নিয়ে নানা নেতিবাচক গল্প শোনা গেলেও, তাবুকের বাংলাদেশীরা স্থানীয় মানুষজনের কাছে বেশ পছন্দের। তারা কৃষি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কেবল নিজেদেরই নয়, দেশেরও সুনাম অর্জন করেছেন এবং সম্মানের সাথে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। এখানকার নতুন প্রজন্ম ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে, এমনকি অনেকে স্কলারশিপও অর্জন করছে। প্রায় এক লাখ বাংলাদেশী যারা তাবুকে থাকেন, তাদের ৭০ শতাংশই সাধারণ কর্মী বা লেবার। তাদের রোজগার হয়তো সীমিত, কিন্তু আয়ের প্রায় পুরোটাই তারা সঞ্চয় করে দেশে পাঠান। তাই এখানকার প্রবাসীকর্মীদের মধ্যে আক্ষেপ, আফসোস, বা হতাশা তুলনামূলকভাবে কম। তাবুকে বাংলাদেশীরা প্রমাণ করেছেন যে, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিজেদের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।

এই ভিডিওতে সৌদি আরবের তাবুক শহরের এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রায় এক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশী সুখে-শান্তিতে কাজ ও ব্যবসা করছেন। এখানে বাংলাদেশীদের কৃষি খামার, তাদের গড়ে তোলা বিভিন্ন ব্যবসা এবং তাবুক কেন অন্য সৌদি শহরগুলো থেকে আলাদা, তা দেখানো হয়েছে। সৌদি আরব মানেই কষ্টের জায়গা—এই প্রচলিত ধারণাকে এটি চ্যালেঞ্জ করে।