পৃথিবীর অন্যতম জনমানবহীন মরুভূমিগুলোর একটিতে বেদুইনদের জীবনযাপন কেমন হতে পারে? সৌদি আরবের বিশাল মরুভূমির অজানা রহস্য কী? আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে দূরে, প্রকৃতির মাঝে শত শত বছর ধরে টিকে থাকা এই যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা আজও বিস্ময় জাগায়। চলুন, আজ আমরা সৌদি আরবের দুর্গম মরুভূমির গভীরে প্রবেশ করি এবং বেদুইনদের অনন্য জীবনযাত্রার এক ঝলক দেখে আসি।
মরুভূমির পরিবর্তিত সৌন্দর্য
সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করার সময় দেখা যায়, মরুভূমির পাহাড়ের রূপ ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়। প্রকৃতির দান কাকে বলে, তা এই অঞ্চলের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দীর্ঘ তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আমরা এমন একটি রাস্তা পার হচ্ছিলাম যেখানে পাহাড় যেন শেষই হচ্ছে না। এই বিশাল পাহাড়ের স্তূপের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে ঝরনা, রয়েছে বনভূমি, আর খেজুর ও পাম বাগান। এই দৃশ্য আমাদের দেখিয়েছে প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি।
বেদুইন কারা?
‘বেদুইন’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘বাদিয়া’ থেকে, যার অর্থ মরুভূমি। এরা মূলত আরব উপদ্বীপের আদিবাসী যাযাবর জনগোষ্ঠী। সৌদি আরব ছাড়াও জর্ডান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের মরুভূমি অঞ্চলে তাদের বসবাস রয়েছে। আধুনিক নগরায়নের জোয়ারে সৌদি আরব দ্রুত বদলে গেলেও, বেদুইনদের জীবনযাপন আজও মরুভূমির ঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং আত্মনির্ভরতার গল্প বহন করে চলেছে।
তাবুকের বেদুইন গ্রামে এক ঝলক
আমরা সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুকের একটি বেদুইন গ্রাম পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এখানে বসবাসকারী বেদুইনরা বেশ সভ্য ও সামাজিক। আমরা সুলতান নামক এক বাড়ির মালিকের আতিথেয়তা গ্রহণ করি। তার খেজুর বাগান ঘেরা ছোট্ট উঠানে সকালের শীত তাড়ানোর জন্য লোহার টেবিলে আগুন জ্বালানো ছিল, আর পাশে গরম হচ্ছিল ঐতিহ্যবাহী গাওয়া কফি। সুলতানদের পূর্বপুরুষরা এখানে থাকতেন না, তবে এই ছোট্ট মরুদ্যানটি উঁচু পাহাড়ে ঘেরা একটি শান্ত পরিবেশে অবস্থিত। নিরাপত্তার জন্য এখানকার বেদুইনরা প্রায়শই সাথে বন্দুক রাখেন।
বেদুইন জীবনযাত্রার পরিবর্তন
ঐতিহ্যগতভাবে, বেদুইনরা স্থায়ী ঘরে বসবাস করতেন না। তারা উট, ছাগল ও ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি ‘বাইতাল সার’ নামক বিশেষ তাবুতে বাস করতেন। তবে বর্তমানে বেশিরভাগ বেদুইন মাটির বাড়ি বা ইটের ঘরে থাকেন, যার ওপরে খেজুর পাতা বা অন্য কোনো ছাউনি থাকে। কিছু পর্যটন প্রধান স্থানে অবশ্য তাবু এখনো দেখা যায়, যা তারা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ব্যবহার করেন। একসময় পশুপালনই ছিল বেদুইনদের প্রধান জীবিকা, বিশেষ করে উট ছিল তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু এখন অনেকেই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন, কেউ কেউ পর্যটকদের জন্য রিসোর্ট তৈরি করছেন, আবার কেউ চাষাবাদেও যুক্ত হয়েছেন। তাদের চেহারা এবং পোশাক-আশাকেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, যা সাধারণ মানুষের মতোই।
ঐতিহ্যবাহী বেদুইন খাবার
বেদুইনদের খাদ্যাভ্যাস এখনো আগের মতোই ঐতিহ্যবাহী। আমাদের জন্য শহর থেকে আসা একজন বাবুর্চি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে এক রাজকীয় খাবার তৈরি করেছিলেন। রান্না শেষে যখন খাবারের প্লেটটি সামনে এলো, তখন আমরা অবাক হয়ে গেলাম। প্লেট থেকে প্রায় উপচে পড়ছিল আস্ত দুম্বা দিয়ে তৈরি বিরিয়ানি! এটি ছিল একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা এবং অত্যন্ত সুস্বাদু একটি খাবার।
প্রকৃতির মাঝে এক আশ্রয়
এই অঞ্চলের ঘরগুলোর জানালা, আঙ্গিনা বা বাহির থেকে তাকালে শুধু পাহাড় আর পাহাড় দেখা যায়। কিছুটা দূরে রয়েছে উপত্যকা, যেখানে সকাল-সন্ধ্যায় সোনালী আলো পড়ে এবং সবুজ গাছগুলো এক অদ্ভুত সুন্দর রূপ ধারণ করে, যা ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো মনে হয়। পাহাড়ি মরুভূমি হলেও জায়গাটি বেশ উর্বর, তাই এখানে খেজুর বাগান ও অন্যান্য ফসলও দেখা যায়। এই বেদুইন বসতিটি দুর্গম মনে হলেও, শহর থেকে গাড়ি চালিয়ে তিন-চার ঘণ্টায় এখানে চলে আসা যায়। অপরূপ প্রকৃতি এবং বেদুইনদের জীবনযাপন দেখতে অনেক পর্যটক এখানে আসেন, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের আয়ের একটি বড় উৎস।
এই ভিডিওতে সৌদি আরবের তাবুকের দুর্গম মরুভূমিতে বেদুইনদের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপন দেখানো হয়েছে। এখানে দেখা যাবে রাস্তাঘাটহীন জনমানবহীন পাহাড়ে কীভাবে এই যাযাবর জনগোষ্ঠী টিকে আছে, তাদের আতিথেয়তা, রাজকীয় দুম্বা বিরিয়ানি এবং ওয়াদি আল দিশার অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য।
ভিডিওটি দেখতে পারেন: https://youtu.be/DKP18arALFE

Leave a Reply